ঢাকা: সরকারি নির্দেশের পর সম্প্রতি আলোচনায় আসা হেফাজতে ইসলাম সম্পর্কে তৎপর হয়ে উঠেছে স্থানীয় প্রশাসন। তারা নিজ নিজ এলাকায় সংগঠনটির ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করছে।
সংগঠনটির নেতাকর্মীদের যেকোনো ধরনের নাশকতা প্রতিহত করতে পুলিশ প্রশাসনকে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। এর সঙ্গে স্থানীয় মাদ্রাসাগুলোকে হেফাজতের ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপের ফাঁদে পা না দিতে সব ধরনের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার সারা দেশের জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা (ইউএনও) সংশ্লিষ্ট এলাকার মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল ও সুপারিন্টেনডেন্টেদের (সুপার) নিয়ে এক ঘরোয়া বৈঠকে বসেন।
বৈঠক সূত্র জানায়, সেখানে প্রশাসন থেকে মাদ্রাসার এসব কর্তাব্যক্তিকে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠান যেন হেফাজতে ইসলাম সম্পর্কে সতর্ক থাকে তার পরামর্শ দেয়া হয়। একই সঙ্গে এ বিষয়ে সরকার কড়া নজরদারি রাখছে বলেও তাদের জানানো হয়।
কোনো মাদ্রাসা থেকে নাশকতা বা নৈরাজ্য ঘটানো হলে তার প্রধানদের এ ব্যাপারে জবাবদিহি করতে হবে। এমনকি নৈরাজ্যের সঙ্গে জড়িতের যথাযথ প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের এমপিও বাতিলসহ বিভিন্ন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে সরকার বাধ্য হবে বলে সাফ জানিয়ে দেয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, গত ৬ এপ্রিল ঢাকা অভিমুখে হেফাজতের লংমার্চে বিপুলসংখ্যক মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি করানোর পরেই মাদ্রাসার সুপারদের ডেকে এ ব্যাপারে সতর্ক করা হয়। তবে তখন কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ হওয়ায় এ ব্যাপারে শুধু মৌখিকভাবেই সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছিল।
কিন্তু গত রবিবার ঢাকা অবরোধে ফের বিপুলসংখ্যক মাদ্রাসা শিক্ষার্থী উপস্থিত হয় এবং তারা সহিংস হওয়ায় এবার প্রশাসন হার্ড লাইনে অবস্থান নিয়েছে। ফের এ ধরনের ঘটনা যাতে না ঘটে সেজন্য মাদ্রাসাগুলোকে সব ধরনের পদক্ষেপ নিতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসক ও ইউএনও’র এসব বৈঠকে গত রবি ও সোমবার যেসব শিক্ষক মাদ্রাসায় অনুপস্থিত ছিলেন, তাদের তালিকা তৈরি করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
ওই সূত্র আরো জানায়, তালিকা হাতে পাওয়ার পর এসব শিক্ষকদের ডেকে মৌখিকভাবে এসব কর্মসূচির ব্যাপারে সতর্ক করে দেয়া হবে। এতে কাজ না হলে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে। প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠানের এমপিও বাতিল করা হবে।
মাদ্রাসার কর্তা ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠকের সত্যতা একাধিক জেলা প্রশাসক ও ইউএনও নিশ্চিত করলেও তারা নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি।
তবে তারা বলেছেন, ‘এলাকার শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক করা হয়েছে। ধর্মীয় উস্কানি দিয়ে যাতে কেউ বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে না পেরে সেজন্য ইমাম ও এলাকার বিশিষ্টজনদের বলা হয়েছে। আর মাদ্রাসা থেকে কেউ যেন বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে না পারে সেজন্য স্ব স্ব প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।’
এ বিষয়ে মাদ্রাসা-ই আলিয়া ঢাকার ভারপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল সিরাজ উদ্দিন আরটিএনএন- কে বলেন, ‘তার প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষক-শিক্ষার্থী নৈরাজ্যমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নন, কখনোই ছিলেন না। তারা সব সময় যেকোনো ধরনের ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে, যারাই তা করুক তারা তা সমর্থন করেন না।’
সরকারি নির্দেশনার ব্যাপারে তিনি স্পষ্ট করে কিছু বলতে রাজি হননি। শুধু জানান, ‘এ ব্যাপারে আমি তেমন কিছুই জানি না।’
রাজধানীর শান্তিনগরের আল্লাহ-রাসুল মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা সাখাওয়াত হোসেন আরটিএনএন- কে বলেন, ‘সরকারের এ ধরনের কোনো নির্দেশনা আমাদের কাছে আসেনি। আমরা সব ধরনের নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে। তবে ইসলাম, নবী (সা.), ঈমান-আক্বিদার ওপর আঘাত আসলে তা প্রতিহত করা প্রত্যেক মুসলমানের কর্তব্য বলে আমরা মনে করি।’
গত ৬ এপ্রিল ঢাকা অভিমুখে হেফাজতে ইসলামের লংমার্চের পর দলীয় নেতাকর্মীদের আওয়ামী লীগের হাই-কমান্ড থেকে সর্বোচ্চ সজাগ থাকার পরামর্শ দেয়া হয়েছিল। এরপরও ক্ষমতাসীন দলটির ভাষায় রবিবার ঢাকায় হেফাজত যে তাণ্ডব চালিয়েছে, তা অকল্পনীয়।
এজন্য ফের যাতে এ ধরনের ঘটনা হেফাজতে ইসলাম ঘটাতে না পেরে সেজন্য তৃণমূল থেকে সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে আওয়ামী লীগ ও তাদের শরিক ১৪ দলের পক্ষ থেকে।
মঙ্গলবার সকালে ১৪ দলের বৈঠক থেকে জোটের শীর্ষনেতারা হেফাজতের ব্যাপারে নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকতে আহ্বান জানান। একই সঙ্গে যেকোনো মূল্যে হেফাজতের ইন্ধনদাতা বিএনপি-জামায়াতের দুদিনের হরতাল এবং আগামী রবিবার হেফাজতের হরতাল প্রতিহত করতে নেতার্মীদের নির্দেশ দেন।
উল্লেখ্য, একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে গত ৫ ফেব্রুয়ারি জামায়াত নেতা আবদুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন দিলে ওইদিন বিকেলেই শাহবাগে সরকার সমর্থকরা তার মৃত্যুদণ্ডসহ সকল যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে অবস্থান নেন।
এই আন্দোলন থেকে এক পর্যায়ে কতিপয় ব্লগার ইসলাম ও নবীকে (সা.) নিয়ে অবমাননাকর লেখালেখি করছে অভিযোগ এনে আত্মপ্রকাশ করে হেফাজতে ইসলাম। তারা প্রথমে এসব কর্মকাণ্ড থামাতে সরকারকে চাপ দেয়ার চেষ্টা করে। এরপর গত ৬ এপ্রিল ধর্মীয় বিদ্বেষ ও ঘৃণা প্রচারকারীদের বিচার দাবিতে এপ্রিল ঢাকা অভিমুখে লংমার্চ কর্মসূচি পালন করে।
চট্টগ্রামের হাটহাজারীর দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম মাদ্রাসাভিত্তিক হেফাজতে ইসলাম ঢাকার লংমার্চের সমাবেশে বিপুল উপস্থিতি ঘটায়। আর এই মাদ্রাসাটির মহাপরিচালক আল্লামা শাহ আহমদ শফীকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় বিদ্বেষ ও ঘৃণার বিরুদ্ধে আলোচনায় আসে হেফাজতে ইসলাম, যার আমিরও তিনি। আর রবিবার ঢাকায় সেই আত্মপ্রকাশের দ্বিতীয় পর্বে ঘটলো শাপলা বিপ্লব ও সরকারি বাহিনীর অভিযান, যা এখন সবার মুখে মুখে।




0 comments:
Post a Comment