ঈদের
ছুটি শুরু হবে বলে ঘরে ফেরা মানুষ এখন কর্মক্ষেত্রের শেষ কাজগুলো গুছাতে
ব্যস্ত। রাজধানীতে যানজটে পড়ে থাকতে হচ্ছে রোজাদার মানুষকে ঘণ্টার পর
ঘণ্টা। মতিঝিল শাপলা চত্বরের যে জায়গাটিতে গত ৫ ও ৬ মে দেশের নবীপ্রেমিক
তৌহিদী জনতা ও আলেম সমাজের উপর সমন্বিত বাহিনীর নির্মম দমনাভিযান সংঘটিত হয়
ঠিক সেখানেই মাথার উপর বিশাল বিলবোর্ডে দেখা যাচ্ছে অসাধারণ এক দৃশ্য।
গোটা বোর্ড জুড়ে পশ্চাদপটে একটি হাফেজী মাদরাসার শ্রেণিকক্ষ। শিক্ষক পড়া
নিচ্ছেন। লম্বা বেঞ্চিতে রাখা উন্মুক্ত পবিত্র কোরআন। কিছু শিক্ষার্থী
হিফজখানায় সবক শুনাচ্ছে। আড়াআড়িভাবে রাখা আরো বেঞ্চি। সবক’টিতেই পবিত্র
কোরআন খোলা অবস্থায় রাখা। বোর্ডের উপরভাগে বঙ্গবন্ধুর ছবি। নিচভাগে কোণায়
প্রধানমন্ত্রীর হাস্যেজ্জল মুখচ্ছবি। দূর থেকে মনে হবে তিনি পবিত্র কোরআনের
পশ্চাদপটের উপর অধিষ্ঠিত। জ্যামে আটকে পড়া পথচারীরা এ বিষয়ে ফ্রি স্টাইলে
নিজেদের মতামত দিয়ে চলেছেন। শাপলা চত্বরের যে বিলবোর্ডে মাদরাসা শিক্ষার
উন্নয়নে সরকারের অবদান প্রচারিত হচ্ছে এর ২০ থেকে ৩০ গজ দূরেই ৫ ও ৬ মে
নিহত অসংখ্য মাদরাসা ছাত্র-শিক্ষকের লাশের ছবি এ মাসেই একটি মানবাধিকার
সংস্থার প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা হয়েছে। সংস্থার বর্ণনা মত এসব লাশ কোন
প্রযুক্তির কারসাজি নয়। সোনালী ব্যাংকের সিঁড়িতে ৩ জন, করিডোরে ৫ জন এবং
সড়ক ও চত্বরজুড়ে অসংখ্য হাফেজ, আলেম ও ধর্মপ্রাণ মানুষের এলোপাতাড়ি মৃতদেহ।
সামনে নির্বাচন, রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নিয়ে যারা সোচ্চার তারা ভালো
করে দেখে নিতে পারেন এই বিলবোর্ডটি।
৫ মে নিরাপত্তাবাহিনী ও সরকার দলীয়
ক্যাডারদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় কারা মসজিদে অগ্নিসংযোগ, পবিত্র কোরআন
অবমাননা, সোনার দোকান লুটের চেষ্টা, স্টেডিয়ামের ভিআইপি গ্যালারি ভাঙচুর,
বৃক্ষ নিধন, আইল্যান্ড উৎপাটন প্রভৃতি করেছে তা ভিডিও ফুটেজ দেখে অপরাধীদের
একজন একজন করে প্রত্যেককেই ধরা হবে বলে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ধর্মপ্রাণ
মানুষকে যতটুকু আশান্বিত করেছিল, সরকারদলীয় লোকদের বেপরোয়া অপপ্রচার ও
আলেম-ওলামাদের বিরুদ্ধে নির্লজ্জ গীবত মানুষকে তারচেয়ে দশগুণ হতাশ করেছে।
হেফাজত, মাদরাসা শিক্ষার্থী বা নিরীহ ধর্মপ্রাণ মানুষ এসব করতে পারে; তা
মানুষ সেদিন যেমন বিশ্বাস করতে পারেনি, আজও তারা তা বিশ্বাস করে না।
হেফাজতের বিরুদ্ধে সরকারের ব্যবস্থা ও আলেম সমাজের সাথে তাদের আচরণ মানুষ
কীভাবে নিয়েছে তার গবেষণা, জরিপ, তথ্য ও অনুসন্ধান যাই হোক, বাস্তব ও
সরল-সহজ চিত্র হচ্ছে ৫ সিটি নির্বাচনের ফলাফল। বিশেষ করে গত ৩১ জুলাই পুত্র
সজীব ওয়াজেদ জয়ের রাজনীতিতে অভিষেকের মত ঘটনার দিন রংপুরে তার বক্তৃতায়
প্রধানমন্ত্রী যে ভাষায় দেশের আলেম-ওলামা, ইমাম, মুয়াজ্জিন ও হাফেজদের উপর
আক্রমণ করেছেন তা মানুষকে খুবই দুঃখ দিয়েছে। মসজিদে মসজিদে যারা মিথ্যাচার
চালাচ্ছে, সেসব ইমাম মুয়াজ্জিন ও আলেমরা কি মুসলমান? এ ধরনের কিছু কথা বলে
প্রধানমন্ত্রী মূলত দেশের আলেম, হাফেজ, ইমাম, মুয়াজ্জিনদের অপমান করেছেন।
অন্তত পুত্র জয়ের অভিষেকের দিনে ধর্মীয় ব্যক্তিবর্গের প্রতি এমন ক্ষোভ ও
অসন্তোষ প্রকাশ করে বক্তব্য না রাখাই তার জন্যে মঙ্গলজনক হত বলে অভিমত
ব্যক্ত করেছেন দেশের ইসলামী নেতৃবর্গ। সজীব ওয়াজেদ জয়ের রাজনৈতিক
কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক সূচনাপর্বে রহমত বরকতের জন্য হলেও এদিন ইমাম,
মুয়াজ্জিন, হাফেজ, আলেমগণের উপর মিথ্যাচারের অপবাদ আরোপ এবং তাদের
মুসলমানিত্বের উপর প্রশ্ন তোলা উচিত ছিল না বলে মন্তব্য করেছেন খেলাফত
আন্দোলন, খেলাফত মজলিস, নেজামে ইসলাম পার্টিসহ অনেকগুলো ইসলামী সংগঠনের
শীর্ষ নেতৃবৃন্দ। এতে প্রধানমন্ত্রীর মনোভাব সম্পর্কে দেশের ধর্মপ্রাণ
মানুষের আবারো ভুল বার্তা লাভ করার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিগত প্রায় ৫ বছরের বিভিন্ন হরতাল,
বিক্ষোভ, প্রতিবাদ, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগের ছবি এবং ৫ মে মঞ্চস্থ নৈরাজ্যের
ঠাসবুননের চিত্র ভিডিও করে বিশ্বদরবারে বাংলাদেশে সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদের
উত্থানরূপে সরকারের পররাষ্ট্র বিভাগই ব্যাপক প্রচার দিয়েছে। এতে যদি বিশ্ব
জনমত সাময়িকভাবে সরকারের পক্ষেও আসে কিন্তু বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও বাংলাদেশের
জনগণের যে জঙ্গীবাদী চেহারা পৃথিবীর সামনে তুলে ধরা হচ্ছে, এর দীর্ঘমেয়াদী
ক্ষতির দায় কে বহন করবে? চিরস্থায়ীভাবে বাংলাদেশের নিরীহ তৌহিদী জনতার এই
ভয়াবহ উগ্রবাদী ছবির মিথ্যা কলঙ্ক কেন বহন করবে তারা? ক্ষমার স্বার্থে
রাজনীতিকদের এ অপরিণামদর্শিতার শেষ কোথায়? বিগত আওয়ামী শাসনামলেও ব্যাপক
প্রচারণার মাধ্যমে বাংলাদেশকে জঙ্গীরাষ্ট্র সাব্যস্ত করার চেষ্টা নেয়া
হয়েছিল। এমনকি তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনকে সাভারের স্মৃতিসৌধে
যেতেও নিরাপত্তা উপদেষ্টারা বারণ করেন এই বলে যে, হেলিকপ্টারে উড়ে যাওয়ার
সময় তার প্রতি এন্টিএয়ারক্রাফট গান থেকে গোলা ছোঁড়া হতে পারে এবং
ঢাকা-গাজীপুর এলাকায় নাকি জঙ্গীদের এমন আয়োজনও আছে। সরকারী প্রচারণা বা
ইচ্ছাকৃত অপপ্রচার যে দেশ ও জাতির কত বড় বদনাম ও সর্বনাশ করতে পারে তার
দৃষ্টান্ত হিসেবে এসব ঘটনা ছোট নয়। চলতি রমজানে শান্তি ও সৌহার্দ্যরে
বাংলাদেশে মার্কিন দূতাবাসে ছুটি দেয়া হল কেবল সন্ত্রাসী কার্যক্রমের
আশঙ্কায়। পবিত্র শবে কদরে নাকি উগ্রপন্থী মুসলমানেরা এসব গুরুত্বপূর্ণ
স্থানে সন্ত্রাসী হামলা চালাতে পারে। দুনিয়ার অন্য অনেক সন্ত্রাস কবলিত
এলাকার সাথে এবছর ঢাকার নামও যুক্ত হল কেবল অপরিণামদর্শী প্রচারণার ফলে।
দেশের এমন ক্ষতি করে, জাতির এমন বদনাম করে ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার এ খেলা
আমাদের কোন্ পর্যন্ত নিয়ে যাবে?
দেশের আলেম-ওলামা, পীর-মাশায়েখ, ধর্মপ্রাণ
শান্তিপ্রিয় জনতার ঐকান্তিক চেষ্টায় সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদের ছোট-বড় প্রতিটি
উদগম যে দেশে গোঁড়াতেই ছেটে ফেলা হয়, নিরীহ প্রশান্ত শান্তির সে দেশে
সরকারী পর্যায়ে যদি অসত্য ও বানোয়াট তথ্য দিয়ে স্বার্থবাজ প্রোপাগা-া
চালানো হয় তাহলে ১৭ কোটির এ দেশে বাস্তবেই জঙ্গীবাদী উত্থান কি চিরঅসম্ভব?
নেতিবাচক প্রচার ও দোষারোপচর্চা নাই বিষয়কেও অনেক সময় বাস্তব বানিয়ে ফেলে।
বাংলাদেশকে কি আসলেই জঙ্গীবাদী সন্ত্রাসমুখর ব্যর্থ রাষ্ট্র বানাতে কোন মহল
কাজ করছে? সংশ্লিষ্ট অপপ্রচারকারীরা কি জেনে না জেনে কারো এজেন্ডা
বাস্তবায়ন করছেন? রাজনীতি বিশ্লেষকদের এসব জিজ্ঞাসার জবাব খোঁজার এখনই
সময়।
দেশের ধর্মীয় অঙ্গনে কিংবা মাদরাসা
শিক্ষিত শ্রেণির মধ্যে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী চেতনা নতুন কিছু নয়। বৃটিশ
সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রাম থেকে আজও পর্যন্ত তারা মুসলিম স্বাতন্ত্র্য ও
স্বকীয়তার জন্যে সাধনায় নিরত রয়েছে। কিন্তু প্রতিবাদ, সংগ্রাম ও যুদ্ধ, যাই
তারা করেছেন, এর কোনটাই অনিয়মতান্ত্রিক কাপুরুষোচিত সন্ত্রাস বা জঙ্গীবাদ
নয়। এ ঐতিহ্য এ অঞ্চলের ধর্মপ্রাণ মানুষ বা ধর্মীয় নেতৃত্বের ইতিহাসে পাওয়া
যাবে না। তারা উদার নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রবক্তা। সন্ত্রাস ও
জঙ্গীবাদের সমর্থক কখনোই নয়। কিন্তু রাজনীতিকদের ভুল কৌশল এ অঞ্চলে খুব
খারাপ পরিণতি ডেকে আনতে পারে বলে বিজ্ঞ মহলের আশঙ্কা। দেশকে জঙ্গীরাষ্ট্র
বানিয়ে তারা কোন্ স্বর্গে যেতে চান সেটাও মানুষের বোধগম্য নয়। দেশের
সেরা একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মূল্যায়ন
অনুযায়ী, গার্ডিয়ানের সাপ্তাহিক প্রকাশনায় সম্প্রতি যে প্রতিবেদনটি
প্রকাশিত হয়েছে সেটি বাংলাদেশকে জঙ্গী প্রবণ ও এদেশের সাধারণ মুসলমানদের
উগ্রবাদী বলে প্রমাণের একটি চেষ্টা। শিরোনামে বলা হয়েছে, ‘হেফাজতের
ব্যানারে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে বাংলাদেশের উগ্রবাদী মুসলমান’। হেফাজতে ইসলাম
বাংলাদেশের প্রধান কার্যালয় হাটহাজারী মাদরাসা ক’সপ্তাহ যাবত সরকারের
নজরদারীতে রয়েছে। এ ধরনের তথ্য নিশ্চয়ই পাঠককে কিছু একটা বলে দেয়। আল্লামা
শফী যখন বলেছেন, ‘আমাদের এ আন্দোলন একটি মহৎ ও সম্পূর্ণ ধর্মীয় আন্দোলন।’
তখন এর স্বরূপ সবার জানা হয়ে গেছে। গার্ডিয়ানের রিপোর্টে বলা হয়েছে, নারী
নীতিতে সরাসরি পবিত্র কোরআন বিরোধী নিয়ম আইনে পরিণত করার প্রক্রিয়া শুরু
হলে ২০১০ সালে হেফাজতে ইসলামের উত্থান ঘটে। তবে কেবল নারীনীতি নিয়েই নয়
সেক্যুলার শিক্ষানীতি, বিতর্কিত নারীনীতি, সংবিধান থেকে আল্লাহ উপর পূর্ণ
আস্থা ও বিশ্বাস তুলে দেয়া, সেক্যুলারিজম ও সোশ্যালিজমকে রাষ্ট্রীয়
মূলনীতিরূপে গ্রহণ ইত্যাদি নানা কারণে দেশের ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষ
সরকারের প্রতি বিরক্ত ও ব্যথিত হয়। তারা তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার হিসেবেই
ক্ষোভ প্রকাশ করে এবং প্রতিবাদী হয়। এরিমধ্যে একশ্রেণির ব্লগার ও অনলাইন
অ্যাকটিভিস্ট ইসলাম, মহানবী (সা.) কোরআন ও ধর্মীয় মূল্যবোধ বিরোধী মারাত্মক
কটূক্তিমূলক লেখা প্রচার করে, যাতে বাংলাদেশের শতকরা ৯৩ জন মানুষের ধর্মীয়
অনুভূতি মারাত্মকভাবে আহত হয়। দেশব্যাপী তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড়
ওঠে। কওমী মাদরাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম মূলত ইসলাম ও মহানবী
(সা.)-এর অবমাননা ইস্যুতেই মাঠে নামে। নাগরিকদের ধর্মীয় অনুভূতি
মারাত্মকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হলে তারা তাদের সাংবিধানিক অধিকারটুকু লাভের আশায়
বিক্ষোভ করে। ধর্ম অবমাননাকারী ব্যক্তিদের শাস্তি দাবি করে তারা
শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক কিছু কর্মসূচি দেয়। দেশের আইন অনুযায়ী
প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কটূক্তি ও তাকে অনলাইনে হুমকি দেয়ার বিচার আদালতে
সংঘটিত হয়ে দোষী ব্যক্তিকে ৭ বছরের কারাদ- দেয়া হয়। একই আদালত ইসলাম ও
মহানবী (সা.)-এর অবমাননাকারী ব্যক্তিকে জামিনে মুক্ত করে দেয়। মহানবী
(সা.)-এর নামে ইতিহাসের নিকৃষ্টতম কটূক্তি প্রচারকারী ব্লগার হিসেবে
অভিযুক্ত এক ব্যক্তি নিহত হলে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তার বাড়ি ছুটে গিয়ে তাকে
শ্রদ্ধা জানানো এবং ৯৩ ভাগ মানুষের হৃদয়ে আঘাতকারী ধিকৃত ব্যক্তিকে নতুন
প্রজন্মের মুক্তিযুদ্ধের প্রথম শহীদ আখ্যা দেয়া থেকে জনগণ একটি ভুল মেসেজ
লাভ করে। ধর্ম ও মহানবী (সা.)-এর অবমাননাকারী ব্যক্তির প্রতি জাতীয় সংসদের
শোক প্রকাশ এবং তাকে কথিত দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের প্রথম শহীদ আখ্যা দেয়ার
সংবাদ মিডিয়ায় এলে জনগণের মাঝে এ ভুল বার্তাটি আরো প্রকট হয়ে ধরা দেয়।
সেক্যুলারিজমের অর্থ তাদের কাছে ধর্ম ও নৈতিকতাবিরোধী একটি ঝড়ো হাওয়া বলে
অনুভূত হয়। ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সংবিধানবর্ণিত মৌলিক মানবাধিকার ভূলুণ্ঠিত
করার হাতিয়ার বলে মনে হয় ধর্মবিদ্বেষী এই ইজমকে। দেশের মানুষের এ
দল-মত-নিরপেক্ষ গণনিন্দা ও প্রতিবাদকে রাজপথে রূপায়িত করে হেফাজতে ইসলাম।
লাখো মানুষের উপস্থিতি ও অংশগ্রহণে তারা কেবল নিন্দা ও প্রতিবাদ জ্ঞাপন করে
এবং রাষ্ট্র ও জনগণের অভিভাবক সরকারকে অবহিত করে তাদের ধর্মীয় বোধ ও চেতনা
সম্পর্কে। ধর্মপ্রাণ মানুষ যে ধর্মীয় মূল্যবোধ নিয়েই নিরাপদে থাকতে চায়, এ
চেতনারই বহিঃপ্রকাশ ছিল হেফাজতের আন্দোলন। যে আন্দোলনের
নেতা-কর্মী-সমর্থকদের মাঝে একজনও কথিত জঙ্গী সন্ত্রাসী বা উগ্রবাদী নন।
৬ এপ্রিল হেফাজত ঢাকা অভিমুখে লংমার্চ
করে। শান্তিপূর্ণ এ কর্মসূচিতে সরকার শতরকম বাধা সৃষ্টি করা সত্ত্বেও
ইতিহাসের সফলতম বহুমুখি লংমার্চ অনুষ্ঠিত হয়। এতে হেফাজত বা ধর্মপ্রাণ
জনসাধারণের ভেতর কোন ধরনের জঙ্গীবাদ বা সন্ত্রাসের নমুনা খুঁজে পাওয়া
যায়নি। ৫ মে সংঘটিত হয় ঢাকা অবরোধ। এতেও সরকারের নানামুখি বাধা, যানবাহন
বন্ধ রাখা, পুলিশ ও রাজনৈতিক ক্যাডারদের হয়রানি ইত্যাদি প্রতিবন্ধকতা
উপেক্ষা করে সংঘটিত সফলতম অবরোধ সাফল্যম-িত হয়। রাজধানীর সব ক’টি প্রবেশ
পথে বিপুল জনতার স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণে সংঘটিত হয় ইতিহাসের বৃহৎ ও
শক্তিশালী অবরোধ। ৫ তারিখে রাজধানীর নগরকেন্দ্রে সরকারী বাহিনী ও রাজনৈতিক
ক্যাডারদের হাতে দিনব্যাপী নির্মমভাবে নিহত হয় বহুসংখ্যক হেফাজতকর্মী।
তাদের গুলি করে, লাঠিপেটা করে কিংবা অন্যকোন পৈশাচিক কায়দায় দিবালোকে হত্যা
করা হয়। ৫ মে গভীর রাতে বা ৬ তারিখের প্রথম প্রহরের অভিযানকালে মতিঝিল
শাপলা চত্বরের অবরোধ মঞ্চের সামনে যে ছ’জনের লাশ কাফন মোড়ানো অবস্থায় পাওয়া
যায়, এদের কারা হত্যা করেছিল তা কি সরকারের জানা নেই? ৬ তারিখ রাতে প্রথম
প্রহরের অন্ধকারে পুলিশ, বিজিবি, র্যাব ও রাজনৈতিক ক্যাডার মিলিয়ে অভিযানে
অংশ নেয়া ১৫/২০ হাজার সশস্ত্র মানুষ; যারা দেড় লক্ষাধিক রাবার বুলেট,
ছররাগুলি, সাউন্ড গ্রেনেড ইত্যাদি ব্যবহার করেছেন বলে দাপ্তরিক বিৃবতিতে
প্রকাশ। এতে অন্ধকার, হুড়োহুড়ি, ভীতি, আতঙ্ক ও আকস্মিকতায় ১০/১৫ লাখ মানুষ
কী ধরনের অমানবিক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিলেন তার আন্দাজ কি সরকার করার
ক্ষমতা রাখে? এ ধরনের দলন পীড়ন ও নিবর্তন মানবাধিকারের কোন পর্যায়ের লংঘন,
এটা কি নিরূপণ করার প্রয়োজন নেই? বলা হচ্ছে ৫ ও ৬ মে মতিঝিলে একটি বুলেটও
খরচ হয়নি, প্রাণঘাতী কোন অস্ত্র ব্যবহৃত হয়নি, একজন মানুষও নিহত হয়নি,
এমনকি হেফাজতকর্মীরা রং মেখে সং সেজে রাস্তায় শুয়েছিল, পুলিশের ধাওয়া খেয়ে
লাশগুলো উঠে দৌড় মেরেছে ইত্যাদি। দাবি করা হচ্ছে যে কোন দেশের ভূমিকম্প বা
সম্মিলিত আত্মহত্যার ঘটনার ছবি জাল করে মতিঝিল ট্র্যাজেডি বলে অনলাইনে
প্রচার করা হচ্ছে। প্রযুক্তির ব্যবহারে এ সবই সম্ভব। কিন্তু মিডিয়ার
প্রচারিত নিহতদের তরতাজা ছবি, শাপলা চত্বর ও আশপাশের রাস্তায় পড়ে থাকা
রক্তাক্ত নিথর দেহ, সোনালী ব্যাংকের সিঁড়ি ও করিডোরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা
আলেম হাফেজ ও ধর্মপ্রাণ মুসল্লীদের লাশ, পরবর্তীতে হাসপাতাল ও বাড়িতে
মৃত্যুবরণকারী তৌহিদী জনতার সদস্যদের মৃতদেহ, কবর, তাদের শোকাহত
আত্মীয়-পরিজন ইত্যাদি সবই কি তাহলে সাজানো? মানবাধিকার সংস্থা ও বিদেশী
মিডিয়ার বর্ণনা অনুযায়ী হতাহতের পরিমাণও কি তবে বানানো? বাংলাদেশ জুড়ে যে
অসংখ্য পঙ্গু, অন্ধ ও মারাত্মক আহত মানুষ এখনও ৫ মে’র ভয়াল স্মৃতি নিয়ে
দুঃখের দিন পার করছেন তাদের সব ভোগান্তিই কি তাহলে মিথ্যা? ধর্ম,
স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার সত্য হলে ৫ ও ৬ মে’র ত্যাগ ও রক্ত তো
বৃথা যাওয়ার কথা নয়। ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানাতে আসা ১৫ লাখ মানুষ যারা
দীর্ঘপথ ভ্রমণ, পদযাত্রা, রৌদ্রতাপ, ক্ষুধা, তৃষ্ণা ইত্যাদি কারণে ছিলেন
শ্রান্ত ক্লান্ত। বিপুল সংখ্যক মানুষ ছিলেন রোজাদার, যাদের পর্যাপ্ত খাবার ও
পানীয় পাওয়ার ব্যবস্থা ছিল না। আল্লাহর জিকির, দোয়া ও রাত পোহানোর
প্রতীক্ষাই ছিল তাদের বিনিদ্র অবস্থানের কাজ। অনেকে ঘুমিয়েও পড়েছিলেন।
মঞ্চে নেতৃবর্গের কিছু বক্তৃতা, সামনে রাখা ৫/৬টি কাফন মোড়ানো লাশ। যাদের
সরকারী ক্যাডাররা দিনের বেলা হত্যা করেছে। এরিমধ্যে এলাকাটি অন্ধকার করে,
মিডিয়া সঙ্কোচন করে সমন্বিত বাহিনীর ‘অপারেশন শাপলা!’ যখন সবশেষ তখন
নিশ্চিদ্র প্রহরায় সিটি কর্পোরেশনের ময়লার গাড়ি এনে পরিষ্কার অভিযান। পানি
দিয়ে গোটা এলাকা ধুয়ে সাদা করে ফেলা। বিদেশী মিডিয়ায় আড়াই হাজার মানুষ
নিহত হওয়ার খবর। প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে নানা কথা, নানা মত। ৫শ’ জন থেকে ৫
হাজার পর্যন্ত এ সংখ্যা ওঠানামা করে। বিচার বিভাগীয় তদন্তের ব্যবস্থা হয়
না। এ ধরনের একটি অভিযানে সমাগত ধর্মীয় জনতা ও আলেমসমাজের চলে যাওয়ার পর
একটি আগ্নেয়াস্ত্র তো দূরের কথা একটি গুলির খোসা বা আপেল কাটার ছুরি
পর্যন্ত মতিঝিলে পাওয়া যায়নি। অথচ দেশের রাজনৈতিক সন্ত্রাসী, ক্যাডার এমনকি
ছাত্রদের কাছেও মারাত্মকসব আগ্নেয়াস্ত্র থাকার নজির বাংলাদেশে অহরহ।
পক্ষান্তরে ধর্মীয় অনুভূতিভিত্তিক গণজাগরণ, ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষের
সমর্থন নিয়ে প্রতিবাদ জানাতে আসা নিরীহ শান্তি প্রিয় হেফাজতকে কি করে
উগ্রপন্থী সংগঠন বলা হয়? হেফাজতকে কেন্দ্র করে জঙ্গীবাদীরা সংগঠিত হবে, এ
ধারণা কোন্ দিক দিয়ে যুক্তিযুক্ত? বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ কোন্
যুক্তিতে উগ্রবাদী আখ্যা পেতে পারে? দেশ যদি জঙ্গীবাদী হয়, দেশের মানুষ যদি
উগ্রপন্থী হয়, যদি দেশে সন্ত্রাস ছড়িয়ে পড়ে তাহলে এর শাসকরা কি সুখে থাকতে
পারবেন? রাজনীতিকরাই বা কতটুক নিরাপদ থাকবেন? নিশ্চয়ই তারা দেশ ও জনগণের
বাইরের কেউ নন।
বাঘ এলো, বাঘ এলো বলে চিৎকার করে গাঁয়ের
লোকের সাথে মজা করার পরিণতি দুষ্ট রাখাল বালকের জীবনে যে বিষাদময় অবস্থা
এনে দিয়েছিল, এমন রস বা তামাশার মন্দ প্রভাব যেন ক্ষমতার মোহে অন্ধ
রাজনীতিকদের জীবনেও ব্যর্থতার গ্লানি ডেকে না আনে। তাদের অপরিণামদর্শিতার
ফলে যেন দেশ ও জাতির কপালেও ভোগান্তি নেমে না আসে। বাংলাদেশের শান্তিপ্রিয়
মানুষের এটাই প্রত্যাশা। ইনকিলাব





0 comments:
Post a Comment