তাজা নিউজ ওহিদ কায়সার চট্টগ্রাম :
নাস্তিক ব্লগারদের শাস্তির দাবিসহ ১৩ দফা দাবি আদায়ে আগামী ৫ মে ঢাকা অবরোধের সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিচ্ছে হেফাজতে ইসলাম। এই কর্মসূচির মাধ্যমে দাবি আদায়ের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। অবরোধ কর্মসূচিতে কাজ না হলে আরো কঠোর কর্মসূচি দিয়ে দাবি পূরণে সরকারকে কিভাবে বাধ্য করা যায় তা-ও চিন্তায় রেখেছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। গতকাল মঙ্গলবার হাটহাজারী মাদরাসায় শীর্ষ নেতাদের এক বৈঠকে এ লক্ষ্যে কর্মকৌশল ঠিক করা হয়েছে। বৈঠকে সার্বিক পরিস্থিতি আলোচনা করে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়া হয় বলে জানা গেছে।
এ দিকে সরকারি মহলের নানা অপপ্রচার সত্ত্বেও হেফাজতের কর্মসূচিতে সারা দেশে ব্যাপক সাড়া পড়ছে। লংমার্চের পর সারা দেশে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে। ৬ এপ্রিল লংমার্চ ও ঢাকায় মহাসমাবেশের পর ইতোমধ্যে বি-বাড়িয়া, ময়মনসিংহ ও সিলেটে অনুষ্ঠিত তিনটি মহাসমাবেশেও লাখ লাখ লোক অংশ নিয়েছেন। এতে দেশব্যাপী হেফাজতের নেতাকর্মীসহ ধর্মপ্রাণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ করা যাচ্ছে। অবরোধ কর্মসূচির আগে চট্টগ্রামসহ আরো কয়েকটি স্থানে অনুষ্ঠেয় মহাসমাবেশেও ব্যাপক সাড়া আশা করছেন হেফাজত নেতারা। ১৩ দফার ব্যাপারে ব্যাখ্যা প্রকাশ করার পর আবারো এসব দাবি জনগণের সামনে তুলে ধরে এর পক্ষে জনমত আরো জোরদার করতে নানা পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।
সরকারি তরফে দাবি মানা সম্ভব নয় বলে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেয়া হলেও তলে তলে হেফাজতের সাথে আলোচনা করার নানা চেষ্টা করছে প্রশাসনের বিভিন্ন পযায়ের কর্মকর্তাসহ মন্ত্রী-এমপিরা। তবে হেফাজতের পক্ষ থেকে আলোচনার ব্যাপারে কোনো আগ্রহ না দেখিয়ে দাবি পূরণে সরকারকে উদ্যোগ নেয়ারই পরামর্শ দেয়া হচ্ছে বলে জানান হেফাজত নেতারা।
সরকারসমর্থিত ঘাদানিক ও শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের হরতাল-অবরোধের মধ্যেও লংমার্চ এবং ঢাকার মহাসমাবেশে লাখ লাখ লোকের উপস্থিতি হেফাজতে ইসলামের আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ হয়। নানা জল্পনা কল্পনার মধ্যেও অনেকটা শান্তিপূর্ণভাবে ৬ এপ্রিল লংমার্চের পর মহাসমাবেশ শেষ হয়। ঢাকার মহাসমাবেশ থেকে আবার মাসব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করে দাবি আদায়ে ৫ মে ঢাকা অবরোধের মতো কঠোর কর্মসূচি দেয়া হয়। তার আগে সিলেট, চট্টগ্রাম, রাজশাহীসহ ৯টি স্থানে পৃথক মহাসমাবেশের কর্মসূচি দেয়া হয়। এসব কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। আর এসব কর্মসূচিতেও লাখ লাখ মানুষের সমাগম হচ্ছে। এতে নেতাকর্মীদের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা বাড়ছে।
এ দিকে হেফাজতের মহাসমাবেশ বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও হেফাজত ও এর ১৩ দফা দাবির বিরুদ্ধে সরকারসমর্থিত বিভিন্ন মহল মিডিয়ায় ঝড় তোলার চেষ্টা করে। ১৩ দফার অন্যতম নারীনীতি ও নারী-পুুরুষের অবাধ মেলামেশা সম্পর্কিত দফাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন নারী সংগঠন মাঠে নেমে আসে। প্রচার করা হয় হেফাজত নারীদের বাইরে বের হওয়া বন্ধ করতে চায়। হেফাজতের পক্ষ থেকে এসব বক্তব্যের প্রতিবাদ জানানো হয়। ১৩ দফার ব্যাখ্যাও দেয়া হয়। সরকারের মন্ত্রী, এমপি ও নেতারা হেফাজতের সমালোচনার পাশাপাশি ‘দাবি পূরণ সম্ভব নয়’, ‘দাবি পূরণের অর্থ মধ্যযুগে ফিরে যাওয়া’Ñ এমন বক্তব্য দিয়ে আসছেন। স্থানীয় সরকার মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের ‘লেজ গুটিয়ে পালিয়ে যাওয়া’ সংক্রান্ত একটি বক্তব্যও হেফাজতের নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করে। এরই মধ্যে সরকার আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। হেফাজতের পক্ষ থেকে গ্রেফতারের কড়া প্রতিবাদ জানানো হয়। শুক্রবার পূর্বঘোষিত বিক্ষোভ কর্মসূচিতে মাহমুদুর রহমানের গ্রেফতারের বিষয়টি সামনে এনে তাকে মুক্তি না দিলে দেশ অচল করে দেয়ার হুমকি দেয়া হয়। হেফাজত কিছুটা নমনীয়Ñ এমন গুঞ্জনও উঠে কোনো কোনো মহল থেকে। এই অবস্থায় গতকাল চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদরাসায় কেন্দ্রীয় নেতারা বৈঠকে বসেন। ঢাকার নেতারাও বৈঠকে যোগ দেন।
হেফাজত সূত্র জানিয়েছে, লংমার্চের আগে কর্মসূচি স্থগিত করার জন্য যেভাবে হেফাজতে ইসলামের সাথে প্রশাসন ও সরকারি দলের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়েছে অবরোধকে সামনে রেখে আবারো সেই ধরনের যোগাযোগ শুরু হয়েছে। সোমবার পুলিশ প্রশাসনের কয়েকজন শীর্ষ নেতা হাটহাজারী মাদরাসায় গিয়ে আলোচনার ব্যাপারে হেফাজতকে রাজি করানোর চেষ্টা করেন। তবে হেফাজতের পক্ষ থেকে দাবি আদায় ছাড়া যেকোনো আলোচনার প্রস্তাব নাকচ করে বলা হয়, দাবি পরিষ্কার হওয়ায় আলোচনার কোনো প্রয়োজন নেই।
গতকাল শীর্ষ বৈঠকে চলমান কর্মসূচি বাস্তবায়নে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ ছাড়া সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়। মাহমুদুর রহমান ইস্যুতে আন্দোলন নিয়ে নানা মতামত গ্রহণ করা হয়। ১৩ দফার আন্দোলনের লক্ষ্য অর্জনের বৃহত্তর স্বার্থেই মাহমুদুর রহমানের মুক্তির জন্য হরতাল বা অন্য কর্মসূচি এখন পর্যন্ত গ্রহণ না করার প্রধান কারণ বলে বৈঠকে শীর্ষ নেতারা জানান। তবে আগামী শুক্রবার মাহমুদুর রহমানের মুক্তির দাবিতে কওমি মাদরাসায় খতমে বোখারি ও বিশেষ মুনাজাত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বৈঠকে আন্দোলকে চূড়ান্তপর্যায়ে নিতে আরো ব্যাপক জনমত গঠনের জন্য সারা দেশে কেন্দ্রীয় নেতাদের সফর এবং আরো অন্তত ১৭টি পয়েন্টে সমাবেশ করার বিষয়ে কিছু সিদ্ধান্ত হয়।
এসব ব্যাপারে জানতে চাইলে হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় মহাসচিব আল্লামা হাফেজ জুনায়েদ বাবুনগরী ফোনে নয়া দিগন্তকে বলেন, আগামী ৫ মে ঢাকা অবরোধের ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে। এ জন্য কী কী করা হবে সে ব্যাপারে কিছু সিদ্ধান্ত হয়েছে। তিনি বলেন, অবরোধ অবরোধের মতোই পালিত হবে। যেভাবে পালিত হওয়ার কথা সেভাবেই পালিত হবে। যখন যেখানে যেভাবে লোক সমাগম হওয়ার প্রয়োজন সেভাবেই হবে। লংমার্চ ও মহাসমাবেশ বাস্তবায়নের কৌশল কর্মসূচির ধরনের কারণেই একরকম হবে না বলে তিনি জানান।
১৩ দফার ব্যাপারে বিভিন্ন মহলের অপপ্রচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এতে কোনো লাভ হবে না। লংমার্চ ও মহাসমাবেশের পর সারা দেশে যে ব্যাপক সাড়া পড়েছে তা অভাবনীয়। তিনি সিলেটের মহাসমাবেশে অংশ নেয়ার কথা উল্লেখ করে বলেন, সেখানে মানুষের ঢল নেমেছিল। তিনি বলেন, অপপ্রচার মোকাবেলায় আমরা ইতোমধ্যেই ১৩ দফার ব্যাখ্যা দিয়েছি। আরবি ও ইংরেজিতে অনুবাদ করে তা বুলেটিন আকারে প্রকাশ করা হবে। বিভিন্ন দূতাবাসেও দেয়া হবে। তিনি বলেন, আমরা জেলা সফর শুরু করছি। কর্মসূচির ব্যাপারে আরো ব্যাপক জনমত গড়ে তোলা হবে।
হেফাজতের কার্যক্রম নিজস্ব গতি ও পরিকল্পনায় এগোচ্ছে জানিয়ে হেফাজতে ইসলামের এই নেতা বলেন, আন্দোলন আরো জোরদার হচ্ছে। তিনি আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকের একটি মন্তব্য উল্লেখ করে বলেন, আমি তার জবাবে বলেছি, কে লেজ গুটিয়ে পালাবে সেটা দেখা যাবে। আন্দোলন কঠোর থেকে কঠোরতর হচ্ছে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকারি মহল থেকে আলোচনার জন্য যোগাযোগ করা হচ্ছে নানাভাবে। কিন্তু আলোচনা কী জন্য? দাবি কী সেটা জানাতেই তো আলোচনা হয়। কিন্তু আমাদের দাবি তো পরিষ্কার। দাবি পূরণ করলেই হবে। তিনি বলেন, আমাদের ১৩ দফা দাবির কোনোটিই সংবিধানবিরোধী নয়। তিনি বলেন, আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাসের নীতি তো সংবিধানসম্মতই ছিল। সরকারই সেটা বদলিয়েছে। অন্যায় তো তারাই করেছে। আমরা আগের অবস্থায় সেটা নিতে বলেছি। সেটা অসাংবিধানিক হয় কিভাবে? তিনি বলেন, ধর্ম অবমাননাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান করে সংসদে আইন পাস হতে সংবিধানে কোনো বাধা থাকার কথা নয়।
প্রসঙ্গত, ঢাকা মহাসমাবেশের ঘোষণা অনুযায়ী হেফাজতে ইসলাম ৮ এপ্রিল সোমবার দেশব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালন করে। ১২ এপ্রিল শুক্রবার বি-বাড়িয়ায় এবং ১৩ এপ্রিল শনিবার ময়মনসিংহ ও সিলেটে মহাসমাবেশ করে। সামনে ১৮ এপ্রিল বৃহস্পতিবার বরিশাল, ১৯ এপ্রিল শুক্রবার ফরিদপুর, ২০ এপ্রিল শনিবার খুলনা, ২৬ এপ্রিল শুক্রবার চট্টগ্রাম, ২৯ এপ্রিল সোমবার রাজশাহী ও ৩০ এপ্রিল মঙ্গলবার বগুড়ায় মহাসমাবেশের কর্মসূচি পালনের কথা রয়েছে। এরই মধ্যে দাবি না মানা হলে ৫ মে রোববার ঢাকা অবরোধ কর্মসূচি পালন করা হবে।




0 comments:
Post a Comment