অধ্যাপক গোলাম আযমের পক্ষে আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক (আর্গুমেন্ট) উপস্থাপন শেষ হয়েছে। বুধবার আসামিপক্ষের যুক্তিতর্কের জবাবে রাষ্ট্রপক্ষের চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক ও সমাপনী বক্তব্য উপস্থাপনের দিন ধার্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।
এর মাধ্যমে গোলাম আযমের মামলাটির বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হতে চলেছে। বুধবার রাষ্ট্রপক্ষ আসামিপক্ষের যুক্তির জবাবে পাল্টা যুক্তিতর্ক ও সমাপনী বক্তব্য উপস্থাপন শেষ করলে আইন অনুসারে
অধ্যাপক গোলাম আযমের বিরুদ্ধে মামলার রায় ঘোষণার দিন ধার্য করবেন চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীরের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল।
সোমবার গোলাম আযমের পক্ষে ১২তম ও শেষ দিনের মতো যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন আসামিপক্ষ। প্রথমে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন ব্যারিস্টার ইমরান সিদ্দিকী। সবশেষে গোলাম আযমের পক্ষে প্রধান আইনজীবী আবদুর রাজ্জাকের আইনি পয়েন্টে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন।
ব্যারিস্টার রাজ্জাক পরে সাংবাদিকদের বলেন, ‘‘আমরা পরিস্কারভাবে বলেছি, গোলাম আযমের সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটির সপক্ষে রাষ্ট্রপক্ষ কোনো দলিল-দস্তাবেজ বা তথ্য-প্রমাণ হাজির করতে পারেননি। এটি তাদের ব্যর্থতা। সুতরাং, ট্রাইব্যুনাল কোনোভাবেই তাকে শাস্তি দিতে পারেন না।’’
অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ সীমন সাংবাদিকদের বলেন, ‘‘আমরা গোলাম আযমের বিরুদ্ধে আনা ৬১টি অভিযোগের সপক্ষে সমস্ত দলিল-দস্তাবেজ ও সাক্ষীদের সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করেছি। এর মাধ্যমে সব অভিযোগ ও পুরো মামলাটি পুরোপুরি প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি। অন্যদিকে আসামিপক্ষ কোনো অভিযোগের বিপক্ষেই সঠিকভাবে দলিল-দস্তাবেজ ও তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি। বুধবার তাদের বক্তব্যের জবাব দেবো এবং এসব বিষয়ে আমরা আরও যুক্তি উপস্থাপন করবো।’’
এর আগে গত ১০ মার্চ থেকে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত গোলাম আযমের পক্ষে আরও ১১ কার্যদিবস যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক, অ্যাডভোকেট মিজানুল ইসলাম ও ব্যারিস্টার ইমরান সিদ্দিকী। অন্যদিকে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ৪ মার্চ পর্যন্ত ১১ কার্যদিবস রাষ্ট্রপক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু, প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ, প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট জেয়াদ আল মালুম ও প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট সুলতান মাহমুদ সীমন।
অন্যদিকে তদন্ত কর্মকর্তা মতিউর রহমানসহ গোলাম আযমের বিরুদ্ধে জব্দ তালিকার ৭ সাক্ষীসহ রাষ্ট্রপক্ষের মোট ১৭ জন সাক্ষী এর আগে সাক্ষ্য দিয়েছেন। আসামিপক্ষ তাদের জেরাও সম্পন্ন করেছেন। তাদের মধ্যে ১ জন সাক্ষীর তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেওয়া জবানবন্দিকেই সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
গোলাম আযমের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষে সাক্ষ্য দেওয়া ঘটনার সাক্ষীরা হলেন, ড. মুনতাসীর মামুন, বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহবুবউদ্দিন আহম্মদ বীরবিক্রম, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা, মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, মুক্তিযোদ্ধা শফিউদ্দিন আহমেদ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পৈরতলা দক্ষিণপাড়া গ্রামের সোনা মিয়া, একজন শহীদ পরিবারের নারী (ক্যামেরা ট্রায়াল), দেশবরেণ্য গীতিকার ও সুরকার আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল, রাজধানীর নাখালপাড়ার ফরিদ আলম এবং মহসিন আলী খান।
আর জব্দ তালিকার সাক্ষীরা হলেন- বাংলা একাডেমীর সহ গ্রন্থাগারিক মো. এজাব উদ্দিন মিয়া, পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) রাজনৈতিক শাখার উচ্চমান সহকারী সেলিনা আফরোজ, কুষ্টিয়া জেলা পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের উচ্চমান সহকারী কাজী আইয়ুব হোসেন, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার কামালের বোন ডা. মুনিয়া ইসলাম চৌধুরী, জাতীয় যাদুঘরের কিপার ড. স্বপন কুমার বিশ্বাস, পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) আমিনুল ইসলাম এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে কর্মরত সাঁট মুদ্রাক্ষরিক জামিনুর শেখ।
মানবতাবিরোধী ৫ ধরনের অপরাধের ৬১টি অভিযোগে অভিযুক্ত করে গত বছরের ১৩ মে গোলাম আযমের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল। ১০ জুন তার বিরুদ্ধে ওপেনিং স্টেটমেন্ট উপস্থাপন করেন রাষ্ট্রপক্ষ। ১ জুলাই থেকে শুরু হয় রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণ।
গোলাম আযমের বিরুদ্ধে পাঁচ ধরনের অভিযোগ হলো, মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র, সহযোগিতা, উস্কানি, সম্পৃক্ততা ও বাধা না দেওয়া এবং ব্যক্তিগতভাবে নির্যাতন।
অভিযোগগুলোর মধ্যে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র সংক্রান্ত ৬টি, তাদের সঙ্গে সহযোগিতা সংক্রান্ত ৩টি, উস্কানি দেওয়ার ২৮টি, তাদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ও হত্যা-নির্যাতনে বাধা না দেওয়ার ২৩টি এবং নির্যাতন সংক্রান্ত ১টি অভিযোগ রয়েছে।
উল্লেখ্য, গত বছরের ১১ জানুয়ারি গোলাম আযমকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ট্রাইব্যুনালের নির্দেশে গ্রেফতার করা হয়।
পরে তাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু কারাগারে পাঠানোর পর চিকিৎসার জন্য তাকে নেওয়া হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিজন সেলে। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার বিচার চলছে।




0 comments:
Post a Comment