রাজশাহী মহানগর ইসলামী ছাত্র শিবিরের অফিস সম্পাদক আনোয়ারুল ইসলামকে (২৮)
আটকের পর গুম করা হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন অধিকার-এর অনুসন্ধানী
প্রতিবেদনে এতথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
অধিকার জানায়, আনোয়ারুল রাজশাহী কলেজের গণিত বিভাগের মাস্টার্স শেষ
বর্ষের ছাত্র ছিলেন। তাকে মাসুম নামে এলাকার লোকজন চিনতেন। ওই এলাকায় মামা
ফজলুর রহমানের বাসায় তিনি থাকতেন। বাড়ি চাপাই নবাবগঞ্জ সদর উপজেলার
আঙ্গারিয়াপাড়া গ্রামে। পিতার নাম ইসরাইল। গত ৫ এপ্রিল রাতে রাজশাহী
মহানগরীর রাজপাড়া থানার নতুন বিল সিমলা মহল্লার ১৭৫ নম্বর বাড়ি থেকে
র্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) ৫-এর সদস্যরা তাকে গ্রেফতার করে।
আনোরুলের মা নূরজাহান বেগম অধিকারকে জানান, খবর পেয়ে তিনি তার মেয়ে
মাহমুদা পারভীনকে নিয়ে ৬ এপ্রিল রাজশাহীতে আসেন। তিনি মাহমুদা পারভীন এবং
ভাইয়ের ছেলে রবির স্ত্রী স্বপ্নাকে নিয়ে র্যাব-৫-এর রেলওয়ে কলোনী
ক্যাম্পে যান। সেখানে এক র্যাব সদস্য তাকে জানান, আনোয়ারুল নামে কাউকে
র্যাব সদস্যরা গ্রেপ্তার করেনি। পরে তিনি মহানগরীর বিনোদপুর বিজ্ঞান ও
শিল্প গবেষণাগারস্থ র্যাব-৫-এর সদর দপ্তরে যান। কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা
বলার জন্য রিসিপশনে নাম এন্ট্রি করেন। কিন্তু তাকে এরপর আর ভেতরে যেতে না
দিয়ে আনোয়ারুলকে র্যাব গ্রেপ্তার করেনি বলে তাকে সেখান থেকে সরিয়ে
দেয়া হয়। পরে তিনি মহানগরীর রাজপাড়া থানা এবং বোয়ালিয়া মডেল থানায়
গিয়ে জেনারেল ডায়রী (জিডি) করতে চাইলে থানা কর্তৃপক্ষ তার জিডি নেয়নি।
রাজশাহী ডিবি (গোয়েন্দা শাখা) অফিসে যোগাযোগ করেও আনোয়ারুলকে পাননি।
তিনি ১৮ এপ্রিল রাজশাহী মূখ্য মহানগর হাকিম আদালতে র্যাব-৫ পরিচালক লে.
কর্ণেল আনোয়ার লতিফ খান, রাজশাহী মহানগর পুলিশ কমিশনার এস এম
মনিরুজ্জামান, রাজশাহী ডিবি (গোয়েন্দা শাখা) পুলিশের অফিসার ইনচার্জ (ওসি)
আলমগীর হোসেন, বোয়ালিয়া জোনের সহকারী কমিশনার রোকনুজ্জামান, বোয়ালিয়া
মডেল থানার ওসি জিয়াউর রহমান, ওসি তদন্ত হাফিজুর রহমানসহ ৪০/৫০জন র্যাব ও
পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে একটি পিটিশন মামলা দায়ের করেন।
নূরজাহান বেগম অধিকারকে বলেন, তার ছেলে অপরাধ করে থাকলে দেশের প্রচলিত আইনে
বিচার হতে পারে। কিন্তু আটকের পর তাকে কেন গুম করা হলো? তিনি তার ছেলেকে
আদালতের কাছে সোপর্দ করার অনুরোধ জানান।
আনোয়ারুলের মামাতো ভাই শামসুল হুদা ইকবাল অধিকারকে জানান, ৫ এপ্রিল রাতে
তালা কাটার শব্দে তিনি ঘুম থেকে জেগে ওঠেন। তিনি দ্বিতীয় তলা থেকে
বিদ্যুতের আলোতে দেখতে পান, ৩০/৩৫জন র্যাবের পোশাক পড়া লোক দ্বিতীয়
তলায় প্রবেশ করার জন্য সিঁড়িতে অবস্থান করছে। একজন র্যাব সদস্য তাকে
গেটের তালা খুলে দিতে বলে। একপর্যায় র্যাব সদস্যদের চাপে তিনি দ্বিতীয়
তলার গেটের তালা খুলে দেন। তখন প্রায় ২০ জন র্যাব সদস্য মারমুখী ভূমিকায়
ঘরে প্রবেশ করেন এবং পরিবারের সদস্যদের করিডোরে বসিয়ে রাখেন, সবার মোবাইল
ফোন সরিয়ে নেন। এরপর তারা পুরো ঘর তছনছ করে তৃতীয় তলায় যান। র্যাব
সদস্যরা ঘুমন্ত অবস্থা থেকে আনোয়ারুলকে গ্রেপ্তার করেন। একজন র্যাব সদস্য
দ্বিতীয় তলা এবং তৃতীয় তলায় ঘন ঘন আসা-যাওয়া করছিলেন, র্যাব সদস্য
বুলবুল এবং নাহিদকে নাম ধরে ডেকে ডেকে বিভিন্ন নিদের্শ দিচ্ছিলেন। র্যাব
সদস্য নাহিদ এবং বুলবুল অভিযানের মুল ভূমিকায় ছিলেন। পরে র্যাব সদস্যরা
নিজেদের বহন করে আনা কয়েকটি ককটেল ও দুটি অস্ত্র আনোয়ারুলের সামনে রেখে
তার বাবা ফজলুর রহমান, সিদ্দিক হোসেন, ইসতিয়াক আহমেদকে ডেকে নিয়ে সাক্ষী
বানিয়ে ছবি তোলে। র্যাব সদস্যরা প্রতিবেশী ৩/৪জন লোকের কাছ থেকেও সাদা
কাগজে স্বাক্ষর নেয়।
রাত আনুমানিক পৌনে ৪টায় র্যাব সদস্যরা আনোয়ারুলকে গাড়ীতে তোলে এবং
আনোয়ারুলের ১টি ল্যাপটপ, পরিবারের ৪টি মোবাইল ফোন, তার ছেলের কম্পিউটারের
সিপিইউ এবং একটি স্কুল ব্যাগ নিয়ে চলে যায়।
ওই এলাকার বাসিন্দা সাবেক পুলিশ কনষ্টেবল ইশতিয়াক আহমেদ অধিকারকে জানান,
১৭৫ নং বাড়িতে যেতে র্যাব তাকে বাধ্য করে। সেখানে তাকে দুটি পিস্তল ও
একটি ককটেলের ব্যাগ, একটি সিপিইউ, একটি ল্যাপটপ, ৪টি মোবাইল ও কিছু বইপত্র
দেখিয়ে উদ্ধারের কথা জানানো হয়। পরে তার কাছ থেকে সাদা কাগজে স্বাক্ষর
নিয়ে আনোয়ারুলকে সঙ্গে নিয়ে র্যাব সদস্যরা চলে যায়। একদিন পরে তিনি
তার একটি নিজস্ব সোর্সের (র্যাব-৫-এ কর্মরত পরিচিত কনস্টেবলের মাধ্যমে)
কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন আনোয়ারুলকে র্যাব-৫-এর অধীনেই রাখা হয়েছে।
ফজলুর রহমান অধিকারকে জানান, সাদাকাগজে তার স্বাক্ষর নিয়ে আনোয়ারুলকে
সঙ্গে নিয়ে চলে যায় যাওয়ার আগে র্যাব সদস্যরা তিনিসহ উপস্থিত ৩-৪ জন
স্বাক্ষীরও ছবি তুলে নেন।
র্যাব হেফাজতে আনোয়ারুলের সাথে থাকা রায়হান আলী অধিকারকে জানান, তিনি
দেখেছেন যে তার পরিচিত আনোয়ারুলকে হেফাজতে জানালার গ্রিলের সঙ্গে হাতকড়া
পরিয়ে রাখা হয়েছে। পরে আটককৃতরা একসঙ্গে আসর, মাগরিব এবং এশার নামাজ
আদায় করেন। একসঙ্গে রাতের খাবারও খেয়েছেন। রাত আনুমানিক ১২টায় র্যাব
সদস্যরা আনোয়ারুলকে সেখান থেকে অন্যত্র নিয়ে যান। এরপর তিনি আদালত থেকে
জামিনে ছাড়া পেয়ে আটকাবস্থা থেকে বেড়িয়ে আসেন।
র্যাব ৫-এর অধিনায়ক লেঃ কর্ণেল আনোয়ার লতিফ খান অধিকারকে জানান, ৫
এপ্রিল ২০১৩ র্যাব সদস্যরা রাজপাড়াতে কোনো অভিযান পরিচালনা করেনি। তাই
আনোয়ারুল নামের কাউকে গ্রেপ্তার করার বিষয়টি সত্য নয়। তবে র্যাব পরিচয়
দিয়ে কোনো সংঘবদ্ধ চক্র করেছে কিনা তা তদন্ত করে দেখবেন বলে জানান।
মহানগর পুলিশ কমিশনার এস এম মনিরুজ্জামান অধিকারকে বলেন, আনোয়ারুল নিখোঁজ
হবার দুদিন পর রাজশাহী মহানগর ছাত্র শিবিরের পক্ষ থেকে মোবাইল ফোনে বিষয়টি
তাকে অবহিত করা হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে কেউ তার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি বলে
তিনি দাবি করে বলেন, আনোয়ারুল নামে কাউকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী
আটকের বিষয়টি তার জানা নেই।
অধিকার সরকারের কাছে আনোয়ারুলকে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে এবং এ
ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি বিধানের জন্য দাবি জানাচ্ছে। কারণ গুম একটি
গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনজনিত মানবতাবিরোধী অপরাধ যা আন্তর্জাতিক অপরাধ বলেও
স্বীকৃত। এর মাধ্যমে জাতিসঙ্ঘ সার্বজনীন মানবাধিকার সনদে ঘোষিত নাগরিক
অধিকারও লঙ্ঘন করা হয়েছে।




0 comments:
Post a Comment