ঢাকা: নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও বসে নেই দলগুলো। ভোটের নানা হিসাব-নিকাষ এখনই শুরু করে দিয়েছে তারা। আধিপত্যের সঙ্গে জনসমর্থন আদায়ে নানাভাবে ভোটারদের সামনে হাজির হওয়ার চেষ্টা করছে স্ব স্ব এলাকার রাজনৈতিক নেতারা।
আর ভোটের হিসাব ঘিরেই পাল্টে যেতে বসেছে মফস্বলের রাজনীতি। এর প্রভাব রয়েছে রাজধানীতে। প্রতিপত্তি, পুঁজির লড়াইয়ে যোগ হচ্ছে পেশীশক্তি। ভোট ঘিরে রাজনৈতিক তৎপরতায় আসছে অস্ত্রের চালান। এ নিয়ে জনমনে আতঙ্ক-উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে এবং আসন্ন সিটি করপোরেশন ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের চোখ ফাঁকি দিয়ে দেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করছে নানা রকম বিদেশি অস্ত্রের চালান।
এতে পেশাদার সন্ত্রাসীদের হাতে অস্ত্রের মজুদ বাড়ছে। আর এসব অস্ত্র দিয়েই খুন, চাঁদাবাজি, ডাকাতি, ছিনতাইসহ নানা অপরাধ সংঘটিত করছে তারা।
সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি এই অস্ত্রগুলো চলে যাচ্ছে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের হাতে। এ কারণে আগামী নির্বাচনগুলোতে এসব অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানিতে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরো অবনতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এসব অবৈধ অস্ত্রের অপব্যবহার রোধে পুলিশ-র্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় গত কয়েকদিনে রাজধানীতে অন্তত ১৮টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার এবং ২২/২৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
অবৈধ অস্ত্রের অপব্যবহার রোধে পুলিশের ভূমিকা প্রসঙ্গে ডিএমপি’র উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমান বলেন, ‘রাজনৈতিক কাজে ব্যবহৃতসহ খুন, ছিনতাই, চাঁদাবাজির মত বিভিন্ন অপরাধে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এইসব অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার দমিয়ে রাখতে পুলিশ এবং গোয়েন্দা পুলিশ ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করছে।’
তিনি জানান, ‘এরই ধারাবাহিকতায় গত কয়েকদিনে বেশ কয়েকটি আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি এবং ম্যাগাজিন উদ্ধারসহ কয়েকজন সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে পুলিশের এ ধরনের অভিযান আরো জোরদার করা হবে।’
বৃহস্পতিবার রাতে পৃথক তিনটি অভিযান চালিয়ে মোহাম্মদপুর এবং শাহআলী এলাকা থেকে ৬টি বিদেশি পিস্তল (৭.৬৫ মিমি ৫টি এবং .২২ বোর রিভলবার ১টি), ২৮ রাউন্ড গুলিসহ মোবারক হোসেন মাসুদ (৩০), শহিদুল আলম খোকন (৩২), মো. ফখরুল ইসলাম অপু (৩১), মো. সুমন হোসেন (২৪), মো. কামরুজ্জামান ইমরানকে (২৬) গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা ও অপরাধ তথ্য বিভাগ (দক্ষিণ)।
গ্রেপ্তারকৃতদের দেওয়া তথ্য মতে, তারা দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ অস্ত্র বিক্রি এবং ভাড়া দিয়ে আসছে। আসন্ন নির্বাচনগুলোতে রাজনীতির মাঠে প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা তাদের কাছ থেকে অস্ত্র কেনে।
তারা দেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে গোপনে এসব অস্ত্র প্রবেশ করে কয়েক হাত ঘুরে সেগুলো তাদের হাতে আসে। সর্বশেষ চালানে গ্রেপ্তাকৃতদের মাধ্যমে মোট ২২টি পিস্তল ঢুকেছে বলে স্বীকার করেছে তারা, যার মধ্যে মাত্র ৬টি উদ্ধার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ।
একই রাতে সাভার থেকে একটি বিদেশি পিস্তলসহ আমজাদ হোসেন (৩৫) এবং আনোয়ার হোসেন (৩২) নামের ২ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বুধবার রাতে রমনা থানাধীন বড় মগবাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১টি পিস্তল এবং ৫ রাউন্ড গুলিসহ সালাউদ্দিন (২৩) ও বাবু (২৫) নামের দুই সন্ত্রসীকে গ্রেপ্তার করে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।
প্রায় দুই সপ্তাহ আগে রাজধানীর মতিঝিল এলাকা থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, ২টি ম্যাগজিন ও ৫ রাউন্ড গুলিসহ রাজু (২৪), আতিক (২২) ও তৌফিককে (২৩) গ্রেপ্তার করে র্যাব।
খিলগাঁও থেকে ১টি পিস্তল, গুলি ও ম্যাগজিনসহ মামুন নামের এক সন্ত্রাসীকে আটক করে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। এছাড়া সায়েদাবাদ রেল লাইনের পশ্চিম পাশে ৩৯/ডি করাতিটোলায় অভিযান পরিচালনা করে সন্ত্রাসী শাকিল মিয়াকে (২৮) ১টি বিদেশি পিস্তল, ১টি ম্যাগজিন ও ৮ রাউন্ড গুলিসহ গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
বাংলাদেশের ভূ-খণ্ডে এসব অবৈধ অস্ত্র কিভাবে প্রবেশ করে সে প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের দেশে পাওয়া সব ধরনের বিদেশি অস্ত্রগুলো মূলত প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে আসে। পার্বত্য চট্টগ্রাম, কুড়িগ্রামের রৌমারি, চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ, রাজশাহীর চারঘাট ইউসুফপুর বিজিবি ফাঁড়ি সংলগ্ন পয়েন্টসহ সীমান্তের প্রায় ৩০টি পয়েন্ট দিয়ে এসব অস্ত্র দেশে প্রবেশ করে। এরপর এগুলো রাজধানীসহ সারা দেশের অস্ত্র ব্যবসায়ী এবং সন্ত্রাসীদের হাতে পৌঁছে যায়।’
উদ্ধারকৃত আগ্নেয়াস্ত্রগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বেশিরভাগ সন্ত্রাসীর পছন্দের তালিকার শীর্ষে রয়েছে ৯ এমএম ও ৭.৬৫ এমএম পিস্তল। আকারে ছোট বিধায় সহজে বহন এবং লুকিয়ে রাখার সুবিধার কারণে এ দুই ধরনের অস্ত্রের চাহিদা বেশি। এসব বিদেশি পিস্তলগুলোর বেশিরভাগই যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি এবং স্পেনের তৈরি।
ডিবি’র যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম জানান, এসব পিস্তল সাধারণত বিক্রির উদ্দেশ্যেই এদেশে নিয়ে আসা হয়। এছাড়া বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য এসব পিস্তল দিনপ্রতি ৫ থেকে ১০ হাজার টাকায় ভাড়াও দেয়া হয়।
সহজেই ভাড়া পাওয়া যায় বলে এগুলো এখন সহজলভ্য হয়ে গেছে এবং এর ব্যবহারে অপরাধের মাত্রা ক্রমাগত বাড়ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
এসব অবৈধ অস্ত্রের মূল্য প্রসঙ্গে মনিরুল ইসলাম আরো বলেন, সাধারণত হাতে বানানো ভারতীয় পিস্তলগুলোর দাম ৪০ হাজার থেকে শুরু হয়। কিন্তু ইউরোপ-আমেরিকায় ইন্ডাস্ট্রিতে মেশিনের মাধ্যমে ম্যানুফ্যাকচারড বিভিন্ন পিস্তলের মূল্য কমপক্ষে ২/৩ লাখ টাকা।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য মতে, দেশে সবচেয়ে বেশি অস্ত্র প্রবেশ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে। গত দেড় বছরে র্যাব, পুলিশ ও বিজিবি যেসব আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করেছে তাদের বেশিরভাগই এসেছে এই সীমান্ত দিয়ে।
পুলিশ, বিজিবি এবং র্যাব সূত্রে জানা যায়, ২০১২ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত বিজিবি ও পুলিশ যৌথ অভিযান চালিয়ে ১৯টি পিস্তল উদ্ধার এবং ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। এছাড়া রাজশাহীতে র্যাব-৫ গত বছর ৮৫টি এবং এবছর এখন পর্যন্ত ২৫টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করেছে। এসব অস্ত্র বহনের সময় র্যাব আটক করেছে ৪৩ জনকে।




0 comments:
Post a Comment