ঢাকা: আদালতে বন্দির পরিবারের প্রতিনিধিত্ব করার বিষয়ে আইনি অধিকার অস্বীকার করেছেন দেশের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। এর মাধ্যমে তিনি নিজ পদে থাকার যোগ্যতা হারিয়েছেন।
সোমবার এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশনের (এএইচআরসি) এক বিবৃতিতে এমন দাবি করা হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, ১৮ এপ্রিল বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সুপ্রিম কোর্টের হাই কোর্ট বিভাগের একটি বেঞ্চের একটি রিট পিটিশন শুনানিতে অংশ নেন। রিটটি করেছিলেন দৈনিক আমার দেশের অন্তর্বর্তীকালীন সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের স্ত্রী ফিরোজা মাহমুদ।
মিসেস মাহমুদ সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা লঙ্ঘন করে ঢাকার সিএমএম আদালত কর্তৃক মাহমুদুর রহমানকে পুলিশি রিমান্ডে প্রেরণের আদেশের বিরুদ্ধে এ রিটটি দায়ের করেছিলেন।
পিটিশনকারীর আইনি উপদেষ্টা সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এ জে মোহাম্মদ আলী আদালতকে জানান, মাহমুদুর রহমানকে ম্যাজিস্ট্রেট আদালত রিমান্ড দেয়ার সময় হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুসরন করেননি এবং তাকে ১৩ দিনের পুলিশি রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়।
গত ১৯ এপ্রিল ইংরেজি দৈনিক ‘নিউ এজ’এর অনলাইন সংস্করনে একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয় যেখানে এ শুনানিতে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের একটি যুক্তিতর্কের উদ্ধৃতি দেয়া হয়।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, মাহবুবে আলম ‘রিট পিটিশনটি সংক্ষেপে এই বলে প্রত্যাখ্যান করেন যে, যেহেতু মাহমুদুর রহমানের স্ত্রী নিজে আক্রান্ত হননি সে কারনে এটা গ্রহণযোগ্য নয়’।
মাহবুবে আলম যুক্তি দেন, ৫৪ ধারা বা সিআরপিসি’র (সন্দেহ) অধীনে সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তারের আইনি বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা এক রিট পিটিশনের পরিপ্রেক্ষিতে হাই কোর্ট রিমান্ড, গ্রেপ্তার এবং জিজ্ঞাসাবাদ বিষয়ে ১৫টি দিক নির্দেশনা জারি করেছে অনেক আগেই।
‘তবে হাই কোর্টের ওই দিক নির্দেশনাগুলো মাহমুদুর রহমানের ক্ষেত্রে খাটবে না। কারণ মাহমুদুর রহমানকে তিনটি মামলায় তার বিরুদ্ধে আনীত নির্দিষ্ট কিছু অভিযোগের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে’ যোগ করেন তিনি।
বিবৃতিতে এএইচআরসি বলে, যখন কোনো ব্যক্তিকে আটক করা হয় তখন জামিন বা অন্য যে কোনো দরকারেই হোক না কেন আদালতের কাছে তিনি নিজে আবেদন করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। আটককৃতের জেল বা রিমান্ড হাজত থেকে বের হয়ে নিজের পক্ষে কোনো আবেদন করার জন্য আদালতের সামনে হাজির হওয়ার কোনো অধিকার আর থাকে না। আটককৃত কোনো আইনজীবীর সাথে তার নিজের মুক্তির দিক নির্দেশনা দেয়ার জন্য সাক্ষাৎ করার অধিকার থেকেও বঞ্চিত হয়।
এ ধরনের একটি আবেদন আদালতে দাখিল করার জন্য দরকারি সমস্ত তথ্য জোগাড় করার মতো সামর্থ্যও থাকে না আটককৃতের। এছাড়াও বন্দিত্বের কারণে কোথাও যেতে না পারার কারণে আটককৃতের কাছে তার আইনজীবীর ফি আদায় করা বা দলিলপত্র এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বা আদালতে আবেদনপত্র দাখিল করার সাথে জড়িত যে কোনো জিনিস পাওয়ার জন্য জরুরি অর্থকড়িও থাকে না।
এসব কারণে বন্দিকে আদালতে কোনো আবেদন দখিল করা বা অন্যান্য বিষয়ের জন্য বাইরে থাকা অন্য কোনো লোকের ওপর নির্ভর করতে হয়। বন্দিদেরকে অবশ্যই অন্যদের সহায়তা নেয়ার সুযোগ করে দিতে হবে। নয়তো তারা কোনো বিষয় আদালতের সামনে হজির করার অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে।
বিবৃতিতে বলা হয়, আইনের শাসনের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত আইনি ব্যবস্থায় যে কোনো আটককৃত ব্যক্তিকেই আদালতের কাছে মুক্তির আবেদন করার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। কোনো বন্দিকে আদালতের কাছে মুক্তির দাবি করা বা সংশ্লিষ্ট যে কোনো বিষয়ে আদালতকে অবহিত করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা বা এ ক্ষেত্রে বাধা বিপত্তি সৃষ্টি করার মানে ওই বন্দির মানবিক মর্যাদা লঙ্ঘন করে তাকে একজন দাসের পর্যায়ে নামিয়ে আনা।
যারা বন্দিত্বের কারণে সরাসরি নিজেরা আদালতে হাজির হতে সক্ষম নয়, তাদের সবচেয়ে কাছের আত্মীয়-স্বজনই তাদের হয়ে আদালতের কাছে তাদের মুক্তির আবেদন করবে এটাই স্বীকৃত। এ ক্ষেত্রে স্ত্রী বা স্বামীই সবচেয়ে কাছের লোক। কোনো স্বামী বা স্ত্রীর তার আটককৃত স্ত্রী বা স্বামীর পক্ষে আদালতে লড়ার অধিকার বিশ্বজনীনভাবে স্বীকৃত অধিকার।
কোনো একজন ব্যক্তিকে আটক করলে শুধু সে ব্যাক্তিই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না বরং তা তার পুরো পরিবারকেই, বিশেষ করে আটককৃতের সবচেয়ে কাছের লোকজনদেরকেও আক্রান্ত করে। সুতরাং তাদেরকে তাদের আটককৃত পরিবারের সদস্যের মুক্তি চাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করার মাধ্যমে আটককৃত এবং তার পরিবার উভয়ের প্রতিই চরম নির্মমতা প্রদর্শন করা হয়। এ নির্মমতা একটি সামজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে খোদ পরিবারের ধারণার ওপরও সরাসরি একটি মারাত্মক আঘাত।
এএইচআরসি বিস্ময় প্রকাশ করে বলে, বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল এসব মৌলিক রীতিনীতির ব্যাপারে একদমই বেখবর। অথচ যে কোনো আইন পদ্ধতিতেই, যেখানে ন্যুনতম আইনের শাসন বজায় আছে সেখানেই এসব মৌলিক রীতিনীতির প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা হয়।
‘অতএব যে ব্যক্তি আদালতে এ কথা উচ্চারণ করতে পারে যে, কোনো বন্দির স্ত্রী তার পক্ষ হয়ে আদালতের কাছে কোনো রিট পিটিশন করার অধিকার রাখে না, তাহলে সে ব্যক্তি শুধু অ্যাটর্নি জেনারেল নয় বরং যে কোনো আইনি পদেই বহাল থাকার তার যোগ্যতা নিশ্চিতভাবেই হারায়’ মনে করে মানবাধিকার সংস্থাটি।
বিবৃতিতে বলা হয়, যদি এমন হয়- অ্যাটর্নি জেনারেল জেনে-শুনেই এ ধরনের অধিকারের কথা অস্বীকার করেছেন এবং আদালতকে বিপথে পরিচালিত করার চেষ্টা করেছেন, তাহলে তো পরিস্থিতি খুবই গুরুতর, নয়কি?
একজন অ্যাটর্নি জেনারেলের কাজ আদালতকে বিপথে পরিচালিত করা নয়, বরং তার কাজ হচ্ছে আদালতকে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় বিচার কার্য সমাধা করতে সহায়তা করা। অ্যাটর্নি জেনারেল আদালতকে বিপথে পরিচালানা করার চেষ্টা মূলত পুরো আইনি কাঠামোকেই হেয় করা।
‘যদি অ্যাটর্নি জেনারেল পুলিশি হেফাজতে মাহমুদুর রহমানের ওপর চালানো নির্যাতনের বিষয়টিও জেনে থাকেন তাহলে এ ক্ষেত্রে বিষয়টি আরো মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে’ অভিযোগ এএইচআরসির।
কোনো বন্দির ওপর যখন নির্যাতন চালানো হয়, তেমন পরিস্থিতিতে একজন অ্যাটর্নি জেনারেলের কাজ ওই বন্দির শত্রুতা করা নয়, বরং আইনের সত্যিকার মূলনীতি সমূহের প্রতিনিধি হিসেবে ওই বন্দির পাশে দাঁড়ানো। কিন্তু তিনি নিজেকে কোনো নাগরিকের শত্রু হিসেবে বিবেচনা করলে তার আর এ পদে বহাল থাকার কোনো যোগ্যতাই অবশিষ্ট থাকে না, মনে করে মানবাধিকার সংস্থাটি।
বিবৃতিতে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়, রাজনৈতিক দাসত্বই হয়তো প্রশাসনকে এমন পরিস্থিতিতে নিয়ে গেছে যেখানে একজন বন্দির নিজেকে তার স্ত্রীর মাধ্যমে উপস্থাপন করার অধিকারটুকুও কেড়ে নেয়া হচ্ছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আরো নির্মম পরিহাস হলো- এ কাজ শুধু ক্ষমতাসীন সরকারই করছে না, বরং রাষ্ট্রের সবোর্চ্চ আইন কর্মকর্তাও করছেন।
গত ২১ এপ্রিল ২০১৩ হাই কোর্ট বেঞ্চ মাহমুদুর রহমানের পক্ষে করা রিট আবেদন খারিজ করে দিয়েছন। আদালতের এ প্রত্যাখ্যানের পিছনে যুক্তি হিসেবে অ্যাটর্নি জেনারেলের যুক্তি গ্রহণ করা হয়ে থাকলে আদালতের এ সিদ্ধান্তও সাধারণ আইনের সেসব মৌলিক নীতিমালার লংঘন যেগুলোর ওপর ভিত্তি করে বন্দিদের অধিকার রক্ষিত হয়।




0 comments:
Post a Comment