সূত্র জানায়, গত ২৪ এপ্রিল ধসে পড়ে
সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ডের আটতলাবিশিষ্ট রানা প্লাজা। সেখানে হতাহত হয়
অনেক মানুষ। গতকাল বিকেল পর্যন্ত ৩৬৯টি লাশ উদ্ধার করা হয়। আহত অবস্থায়
উদ্ধার করা হয় প্রায় তিন হাজার মানুষকে। এখনো প্রায় দেড় হাজার মানুষ
নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা যায়। ঘটনার পরপরই এই এলাকায় ছুটে আসেন
বিপুলসংখ্যক মানুষ। সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স, রেড
ক্রিসেন্ট, স্কাউটসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠনের পাশাপাশি
উদ্ধারকাজে অংশ নেন বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষ। এ দিকে আটকে পড়া মানুষ এবং
হতাহতদের সন্ধানে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ছুটে আসেন অনেক উৎসুক মানুষ।
আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব রয়েছে র্যাব-পুলিশের হাতে।
সূত্র জানায়, হতাহত মানুষ এবং আটকে
পড়াদের খোঁজে যারা সাভারে এসেছেন তারা গত পাঁচ দিন ধরেই অবস্থান করছেন
দুর্ঘটনাস্থলে। অনেকের নাওয়া-খাওয়া পর্যন্ত নেই। রাতে ঘুম নেই। কোথাও বসে
রাত কাটাবেন সেই ব্যবস্থাও নেই। এরই মধ্যে অসহায় এ মানুষগুলো আবার
প্রতারণারও শিকার হচ্ছেন। খবর পাওয়া গেছে, বিভিন্ন অজুহাতে এসব মানুষের
কাছ থেকে একটি দুর্বৃত্তচক্র অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। এমনকি নিখোঁজ
গার্মেন্টকর্মীদের খোঁজ দেয়ার কথা বলেও অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে এই
দুবর্ৃৃত্তচক্র। গতকাল শাহ আলম নামের এক ব্যক্তি জানান, তিনি তার বোনের
খোঁজে এসেছেন। গত পাঁচ দিন ধরেই তিনি আছেন দুর্ঘটনাস্থলে। গত শনিবার রাতে
এক তরুণ তার কাছ থেকে ২০০ টাকা নিয়েছে পাশেই একটি স্থানে তাকে ঘুমানোর
ব্যবস্থা করে দেয়ার কথা বলে। অনেকে আবার পকেট মারেরও শিকার হচ্ছেন বলে
জানা গেছে।
ঘটনার পর অনেক মানুষ অসহায় মানুষের জন্য
ওষুধসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পণ্য নিয়ে হাজির হচ্ছেন দুর্ঘটনাস্থলে। সেখানে
কে কী পরিমাণ সহায়তা দিচ্ছেন তার কোনো হিসাব নেই কারো কাছে। যে যেভাবে
পারছেন এগুলো হাতিয়ে নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। জসিম নামে এক ব্যক্তি
জানান, তিনি কয়েকটি অক্সিজেন সিলিন্ডার, কিছু শুকনো খাবার ও মাস্ক নিয়ে
ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন শনিবার সকালে। সেখানে এক তরুণ তার কাছ থেকে ওগুলো
নিয়ে যায় ‘লাগবে’ বলে। এরপর ওই তরুণের কোনো খোঁজ নেই। জসিম জানান, পরে
বুঝতে পেরেছেন তিনি প্রতারকের খপ্পরে পড়েছেন। বিষয়টি তিনি উপস্থিত পুলিশ
সদস্যদের অবহিত করেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ত্রাণসামগ্রী একটি স্থানে
জড়ো করা হয়েছে। সেখান থেকেও খোয়া যাচ্ছে বেশকিছু। স্বেচ্ছাসেবী সেজে
অনেকে সেগুলো নিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সাভারের কয়েকটি হাসপাতাল ও কিনিকের
বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তারা আহতদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ রয়েছে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা প্রদানের। কিন্তু
এমনও ঘটেছে হাসপাতালের টাকা দিতে দেরি হওয়ায় রোগী আটকে রেখেছে। অনেক
হাসপাতালে সুচিকিৎসা প্রদানের কথা বললেও তারা আসলে কোনো চিকিৎসাই দিচ্ছে
না। দ্বীপ নামের একটি হাসপাতালের কয়েকজন রোগী জানিয়েছেন, তাদের তেমন
চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে না।
এ দিকে ঘটনার পর আমিন বাজার ব্রিজ থেকে
নবীনগর পর্যন্ত সড়ক বন্ধ করে দেয়ায় গোটা সাভারে এখন নিত্যপ্রয়োজনীয়
দ্রব্যের দারুণ সঙ্কট দেখা দিয়েছে। এই সুযোগে একটি চক্র নিত্যপ্রয়োজনীয়
পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েকগুণ। ওই এলাকায় যে দু-একটি দোকান খোলা
আছে তাতে চড়ামূল্যে বিক্রি হচ্ছে পণ্যসামগ্রী।
এ দিকে সবচেয়ে ভয়াবহ প্রতারণা শুরু
হয়েছে নিহতদের লাশ নিয়ে। বিশেষ করে বেওয়ারিশ লাশগুলোর দিকে টার্গেট করে
আছে একটি সঙ্ঘবদ্ধ চক্র। ইতোমধ্যেই তাদের দু-একটি জঘন্য কাণ্ড ধরা পড়েছে।
থানায়ও অভিযোগ গেছে এ বিষয়ে। ইতোমধ্যে কয়েকটি লাশ অন্যরা নিয়ে গেছে বলে
প্রশাসনের কাছে ধরা পড়েছে। আরো কয়েকটি লাশ নেয়ার চেষ্টা চললেও তা
প্রশাসনের শক্ত অবস্থানের কারণে সফল হয়নি।
সূত্র জানায়, এসব লাশ দাফনের জন্য দেয়া
হচ্ছে ২০ হাজার টাকা। আবার নিহতের স্বজনদের জন্য সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন
অনুদানেরও ঘোষণা রয়েছে। এসব কারণে সঙ্ঘবদ্ধচক্রটি চাচ্ছে কোনোভাবে স্বজন
বলে যদি কারো লাশ ভাগিয়ে নেয়া যায়। সাভার থানা পুলিশ জানিয়েছে, এমন
দু’টি অভিযোগ পাওয়া গেছে এ পর্যন্ত। বেওয়ারিশ লাশের মধ্যে ঢাকা মেডিক্যাল
কলেজ হাসপাতাল ও মিটফোর্ড হাসপাতালে রাখা আছে প্রায় অর্ধশত। এই দুই
হাসপাতাল ঘিরেও প্রতারকচক্র ঘুরঘুর করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ দিকে
সাভার থানা পুলিশ জানিয়েছে, কয়েকটি ঘটনা তাদের নজরে আসায় এখন যে কেউ
বললেই লাশ দেয়া হচ্ছে না। যাচাই-বাছাই করে লাশ দেয়া হয়। সূত্র: নয়া
দিগন্ত




0 comments:
Post a Comment