পুলিশ
হেফাজতে আমরণ অনশন শুরু করেছেন আমার দেশের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর
রহমান। ডিবি পুলিশের হেফাজতে থাকাকালীন তিন দিন আগে তিনি আমরণ অনশন শুরু
করেন। বুধবার তার স্বাস্থ্যের দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকলে তাকে ঢাকার অতিরিক্ত
মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে হাজির করা হয়। আদালত ছয় দিনের রিমান্ড বাকি
থাকতে তাকে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। সরকারি কাস্টডিতে মাহমুদুর
রহমানের জীবনাশঙ্কা দেখা দেয়ায় কারাগারের বাইরে যেকোনো হাসপাতালে তার
চিকিৎসার দাবি জানিয়েছেন নাগরিক অধিকার রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক ও বিশিষ্ট
বুদ্ধিজীবী ফরহাদ মজহার।
মাহমুদুর রহমানকে গত ১১ এপ্রিল আমার দেশ কার্যালয় থেকে কমান্ডো স্টাইলে
তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ, ধর্মীয় অনুভূতিতে
আঘাত, উসকানিসহ তিনটি মামলা দায়ের করা হয়। ওই দিনই তিনটি মামলায় তাকে
মোট ১৩ দিনের পুলিশি রিমান্ডে দেন আদালত। বুধবার একটি মামলায় রিমান্ড শেষ
হলে তাকে আদালতে তোলা হয়। মাহমুদুর রহমান আটকাবস্থায় আমার দেশ পত্রিকার
প্রেস সিলগালা করে দেয় পুলিশ। অন্য প্রেস খেকে পত্রিকাটি মুদ্রণের
প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালান দৈনিকটির সাংবাদিক-কর্মচারীরা। কিন্তু গত
শনিবার রাতে আমার দেশের মুদ্রিত কয়েকহাজার কপি পুলিশ জব্দ করে নিয়ে যায়।
একই সাথে বেআইনি পত্রিকা প্রকাশের অভিযোগে মাহমুদুর রহমানের মা ও আমার
দেশের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মাহমুদা বেগম এবং দৈনিক সংগ্রাম সম্পাদক আবুল
আসাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। ফলে গত পাঁচ দিন যাবৎ আমার দেশ
প্রকাশ হয়নি। মাহমুদুর রহমান আটক অবস্থায় এ কথা জেনে আমরণ অনশন শুরু
করেন। পুলিশ হেফাজতে বিভিন্ন রকম মানসিক নির্যাতন, মায়ের বিরুদ্ধে মামলা,
পত্রিকা বন্ধ করে দেয়ার খবর শুনে মাহমুদুর রহমান প্রতিবাদ হিসেবে আমরণ
অনশন শুরু করেছেন বলে তার আইনজীবীরা জানিয়েছেন।বুধবার দুপুর ১২টার দিকে ডিবি পুলিশ একটি সাদা গাড়িতে করে মাহমুদুর রহমানকে ঢাকা সিএমএম আদালতে নিয়ে আসে। এ সময় তাকে খুবই ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। তার পরণে ছিল পাজামা-পাঞ্জাবি এবং পায়ে ছিল চটি স্যান্ডেল। তাকে বেলা ২টার সময় পুলিশ আদলতের কাঠগড়ায় নিয়ে আসে। তিনি বসা অবস্থা থেকে উঠতে পারছিলেন না। আদালতে তিনি কোনো বক্তব্য রাখেননি। আমার দেশের নির্বাহী সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমদ এবং আইনজীবীরা তার সাথে কিছু সময় কথাবার্তা বলেন। মাহমুদুর রহমান আইনজীবীদের কাছে ওকালতনামা প্রদান করেন। তার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত নাজুক দেখে বেলা ২টা ৩৫ মিনিটে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত।
তবে তার পক্ষে কোনো জামিন আবেদন ছিল না। তাকে কারাগারে প্রথম শ্রেণীর মর্যাদা ও সুচিকিৎসা দেয়ার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম মো: শহীদুল ইসলাম কারা বিধি মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য কারা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন।
মাহমুদুর রহমান তার আইনজীবীদের মাধ্যমে তিনটি দাবি তুলে ধরেন। এ সময় আদালতে প্রচণ্ড হই চই ও চেঁচামেচি শুরু হলে ম্যাজিস্ট্রেট এজলাস কক্ষ দ্রুত ত্যাগ করে খাস কামরায় চলে যান।
মাহমুদুর রহমানের দাবি তিনটি হলো : আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তার মা মাহমুদা বেগমের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা বিনাশর্তে তুলে নিতে হবে, বেআইনিভাবে আমার দেশ পত্রিকার প্রেসে লাগানো তালা অবিলম্বে খুলে দিতে হবে এবং পত্রিকা প্রকাশে বাধা তুলে নিতে হবে ও গ্রেফতারকৃত ১৯ জনকে বিনাশর্তে ছেড়ে দিতে হবে। এ দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তিনি অনশন করে যাবেন। তিনদিন ধরে তিনি কোনো খাবার-পানি খাননি।
আইনজীবীরা আদালতে মাহমুদুর রহমানের কথাগুলো তুলে ধরে আরো বলেন, মাহমুদুর রহমানের একটাই অস্ত্র ছিল তা তার কলম। সরকার তার কলম কেড়ে নিয়েছে। রিমান্ডে নিয়ে তার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করেছে। তাকে রিমান্ডে নিয়ে অত্যাচার করেছে। ফলে তার শরীর ভেঙে পড়েছে। তিনি গুরুতর অসুস্থ। তার সুচিকিৎসা প্রয়োজন। জালিম সরকারের বিরুদ্ধে ইসলামের বিধান হচ্ছে প্রতিবাদ করা। এখন সরকার তার ওপর অত্যাচার করছে, যা কলম দিয়ে প্রতিবাদ তিনি এখন করতে পারছেন না। তাই তিনি অনশনের মাধ্যমে এ অত্যাচার, জুলুম ও নির্যাতনের জন্য প্রতিবাদ করছেন। এতে তার মৃত্যু হলেও তিনি প্রতিবাদস্বরূপ অনশন করে যাবেন। তিনি স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছেন। আর এ জন্য আল্লাহই তাকে ক্ষমা করবেন।
আদালতে যে দিন তাকে নিয়ে আসা হয় সে দিন তিনি আইনজীবীদের ওকালতনামা দেননি। কারণ তিনি জানেন বিচার বিভাগ স্বাধীন হলেও বিচারকেরা স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ ছাড়া জামিন দিতে পারবে না এবং রিমান্ড দেবেই। তিনি জানেন বলেই সে দিন কোনো আইনজীবী নিয়োগ করেননি।
আইনজীবীরা আদালতে বলেন, পৃথিবীর ইতিহাসে এমন নজির নেই যে, একজন সাংবাদিককে ১৩ দিনের রিমান্ডে দিতে হবে। বিচার বিভাগ স্বাধীন হলে এমন অবস্থা হবে না। কারণ বিচারকেরা ওপরের চাপেই স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেননি। এ কথা বলার সময় আদালত আইনজীবী খোরশেদ আলমকে বলেন, ‘আপনি কথা বলছেন, আপনার নাম ওকালতনামায় নেই। আপনি কথা বলতে পারেন না।’ এ সময় আইনজীবীগণ প্রতিবাদ করতে থাকলে প্রচণ্ড হই চই চেঁচামেচি শুরু হয়। এরপর আদালত দ্রুত আদেশ দিয়ে এজলাস কক্ষ ত্যাগ করেন।
আসামিপক্ষে মামলা পরিচালনা করেন মো: সানাউল্লাহ মিয়া, মাসুদ আহমেদ তালুকদার, খোরশেদ আলম, খোরশেদ আলম মিয়া, মহসিন মিয়া, ইকবাল হোসেন, আজিজুল ইসলাম খান বাচ্চু, হোসেন আলী খান হাসান, ওমর ফারুক, তাহেরুল ইসলাম, শামসুজ্জামান, জয়নাল আবেদীন মেজবাহ, আ: রশিদ মোল্লা, মহিউদ্দিন চৌধুরীসহ বেশ কিছু আইনজীবী।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই শাহনুর ইসলাম প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন আসামিকে সাত দিনের রিমান্ডে নিয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তিনি স্কাইপ সংলাপ প্রকাশের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তার দেয়া তথ্য যাচাই বাছাই চলছে। এমতাবস্থায় তাকে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত জেলে আটক রাখা প্রয়োজন।




0 comments:
Post a Comment