গত ৩ আগস্ট সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য হেমায়েতউল্লাহ আওরাঙ্গ। এর আগে ২৬ জুলাই গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নিহত হন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য গোলাম সবুর টুলু। এভাবে অনেকেই সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে পরপারে চলে গেছেন। কিন্তু থামছে না দুর্ঘটনা।
দিন দিন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সারি বাড়ছেই। এই সারিতে যোগ হচ্ছে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে আইনপ্রনেতারাও। তারপরেও কোনও কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না সরকার। ক্ষোভ প্রকাশ করে নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের উদ্যোক্তা ও চেয়ারম্যান অভিনেতা ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, সরকারের মন্ত্রীরা সড়ক দুর্ঘটনায় মারা না গেলে টনক নড়বে না।
মঙ্গলবার ঢাকা টাইমসের পক্ষ থেকে সাম্প্রতিক সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে ইলিয়াস কাঞ্চনের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনায় তিনি বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সরকারকে লিখিত প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কোনও সরকারই সেই প্রস্তাব আমলে নেয় না। ফলে দুর্ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলছে।
ক্ষোভের সুরে ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, আমি নায়ক মানুষ। এই সব কাজ তো আমার নয়। এগুলো সমাধান করার কাজ সরকারের।কিন্তু সরকার কোনও পদক্ষেপই নিচ্ছে না। তারা এগুলো নিয়ে তামাশা করছে।
তিনি বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সরকারকে একাধিক প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে- প্রতিটি জেলায় চালকদের জন্য ট্রেনিং ইনস্টিটিউট গঠন করা, মহাসড়কগুলোতে ৪০ মাইল অন্তর একটি করে ট্রমা সেন্টার তৈরি করা। যাতে সড়ক দুর্ঘটনায় আহতরা তাৎক্ষণিক চিকিৎসা নিতে পারে।
এছাড়া প্রতিটি মহাসড়কের জন্য একটি করে হেলিকপ্টরের ব্যবস্থা করা। পাশাপাশি শুধুমাত্র সড়ক দুর্ঘটনায় আহতের জন্য একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা। এগুলোর জন্য খুব বেশি টাকা দরকার তা নয়। আমি বর্তমান সরকারকে ২ হাজার কোটি টাকার একটি প্লান দিয়েছিলাম। কিন্তু তারা সেটি বাস্তবায়ন করেনি। বড়ই আপসোস। কোনও সরকারই সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়টি গুরুত্ব দেয় না। অথচ যে কেউ এর শিকার হতে পারে।
ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, বিএনপি আমলে তৎকালিন অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের কাছে হাসপাতালের জন্য জমির আবেদন করেছিলাম। কিন্তু তার ছেলেদের জন্য সে দিতে পারেনি। অথচ জমিটি দিলে আজ হাসপাতাল তৈরি করে অনেক প্রাণকে রক্ষা করা যেতো। কারণ সড়ক দুর্ঘটনায় আহতরা ‘প্রোপার ট্রিটমেন্ট’ পেলে খুব তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠে। এর জ্বলন্ত প্রমাণ আমি নিজেই।
আমি যখন সড়ক দুর্ঘটনায় শিকার হই তখন সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা নিয়ে আমি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যাই। অথচ বাংলাদেশের চিকিৎসকরা বলেছিল আমার হাত কাটতে হবে। কিন্তু সিঙ্গাপুরে উন্নত চিকিৎসা করায় আমি রক্ষা পেয়েছি। তাই, আমার একটা স্বপ্ন ছিল অত্যাধুনিক একটি হাসপাতল তৈরি করবো সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের জন্য। কিন্তু সরকার তা পুরণ হতে দিচ্ছে না।
তিনি বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সবচেয়ে যেটা খুব জরুরি সেটা হচ্ছে চালকদের প্রোপার ট্রেনিং দেওয়া। তাদেরকে ট্রেনিং না দিলে তারা কিভাবে গাড়ি চালাবে। একজন চালক কত সময় গাড়ি চালাবে। তাদের বেতন কাঠামো কেমন হবে। এসব কিছুই কিন্তু চিন্তার বিষয়। কারণ এটাতো সায়েন্টিফিক বিষয়।
একজন ড্রাইভার যদি ২৪ ঘন্টাই গাড়ি চালায়, তাহলে সে ঘুমাবে কখন। তখন তো তাকে বাধ্য হয়েই গাড়িতে ঘুমাতে হবে। আর তখনই দুর্ঘটনার মতো ঘটনা ঘটে। সুতরাং ট্রেনিংয়ের বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য আমি স্বল্প পরিসরে ট্রেনিং দিয়ে থাকি। আমার ফান্ড নেই। নিজের সামর্থে যেমন পারি তেমন প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকি। এটা সরকারের বৃহত্তম পরিসরে করা উচিত।
দেশব্যাপী ক্রমবর্ধমান সড়ক দুর্ঘটনা নিরসনে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির প্রয়োজনে এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবিতে ১৯৯৩ সালে চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ (নিসচা) নামের একটি সংগঠন।
সংগঠন সম্পর্কে ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, সড়ক দুর্ঘটনামুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে গঠিত নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) তার কার্যক্রমের মধ্যদিয়ে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই দেশের সর্বস্তরের মানুষের সমর্থনে ধন্য হয়ে ওঠে। নিরাপদ সড়ক চাই তার প্রতিষ্ঠার এই ২০ বছরের মধ্যে জনকল্যাণমুখী সংগঠন হিসাবে তার ব্যাপক কর্মতৎপরতায় দেশের সীমানা ছাড়িয়ে ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পেয়ে গেছে যথেষ্ট পরিচিতি। নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) এখন একটি সফল সামাজিক আন্দোলনের নাম।
১৯৯৩ সালের ২২ অক্টোবর মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে মর্মান্তিকভাবে নিহত হন চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের স্ত্রী জাহানারা কাঞ্চন। উল্লেখ করা যেতে পারে এরও আগে ১৯৮৮ সালে চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন স্বয়ং মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছিলেন। নিজের জীবনের মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা এবং স্ত্রী বিয়োগের বেদনার বাস্তবতা, নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনকে উদ্বুদ্ধ করে, সড়ক দুর্ঘটনায় স্বজন হারানো এবং ক্ষতিগ্রস্ত পঙ্গু মানুষের পাশে দাঁড়াতে। ক্রমবর্ধমান সড়ক দুর্ঘটনা নিরসনে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবিতে ১৯৯৩ সালের ১ ডিসেম্বর বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা থেকে জাতীয় প্রেসক্লাব পর্যন্ত ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ শীর্ষক এক পদযাত্রায় শামিল হন তিনি। সে দিনের সেই পদযাত্রা এবং নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনকে সাংগঠনিক পর্যায়ে রূপদানের পরামর্শ এবং অনুপ্রেরণা নিয়ে ইলিয়াস কাঞ্চনের নেতৃত্বে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ শীর্ষক প্রথম পদযাত্রায় বিভিন্ন সংগঠনসহ সর্বস্তরের মানুষের ব্যাপক অংশগ্রহণই তাকে এই আন্দোলনে ব্যাপক উৎসাহ যোগায়।
সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চনকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। সেই সাথে প্রতিবছর সরকারি উদ্যোগে ২২ অক্টোবর জাতীয় পর্যায়ে নিরাপদ সড়ক দিবস পালনেরও ঘোষণা দিয়েছে। সে থেকে প্রতিবছর ২২ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। কিন্তু জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস ঘোষণার বিষয়টি সরকারি মন্ত্রী পরিষদে পাস না হওয়ায় এবং সরকারি গেজেট আকারে প্রকাশিত না হওয়ায় ২২ আক্টোবর সরকারি তেমন কোন কর্মসূচি পালিত হয়নি। ফলে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের বিষয়টি মন্ত্রী সভায় পাস করে সরকারি গেজেট আকারে প্রকাশ করতে নিসচা বর্তমান সরকারের কাছে দাবি জানায়।
নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) -এর পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিবছর ২২ অক্টোবর নিরাপদ সড়ক দিবস পালনের উদ্যোগ নেয়ার জন্য জাতিসংঘের কাছে প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। এই বিষয়ে জাতিসংঘ আন্তর্জাতিকভাবে নিরাপদ সড়ক দিবস পালনের নিমিত্তে ২০০৪ সালের ৭ এপ্রিল এক সভার আয়োজন করে এবং সেই সভাতে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) -এর প্রতিনিধিকে উপস্থিত থাকার জন্য আমন্ত্রণ জানায়।
উল্লেখ্য, জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০০৬ সালে “২২ এপ্রিল হতে ২৯ এপ্রিল” নিরাপদ সড়ক সপ্তাহ পালিত হয়। নিরাপদ সড়ক চাই দক্ষ চালক তৈরীর লক্ষ্যে প্রতি জেলায় একটি করে দেশে ৬৪টি ড্রাইভিং ট্রেনিং ইনস্টিটিউট স্থাপনের জন্যে সরকারের কাছে দীর্ঘদিন যাবত দাবি জানিয়ে আসছে।
কিন্তু কোন সরকার-ই এ পর্যন্ত এ বিষয়ে কার্যকর কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। নিরাপদ সড়ক চাই নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ইতিমধ্যে নিসচা ড্রাইভিং ট্রেনিং ও মেকাক্যিাল ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেছে। এই ইনস্টিটিউটে দক্ষ চালক তৈরীর লক্ষ্যে ড্রাইভিং পেশায় আসতে আগ্রহী এসএসসি পাশ বেকার তরুণ/তরুণীদের বিনামূল্যে ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে।
এই পর্যন্ত ১০টি ব্যাচে প্রায় ২২০জন চালক এই ইনস্টিটিউট থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছে। এছাড়া নিরাপদ সড়ক চাই দেশের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মোট ১৮টি স্থানে পেশাজীবী চালকদের দক্ষতা ও সচেতনা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ১দিনের প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করে।
ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, সরকারিভাবে গঠিত হয়েছে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, নিসচা’র উত্থাপিত দাবির আলোকে সরকার অনতিবিলম্বে জাতীয় সড়ক নীতিমালা প্রণয়নেও তৎপর হবেন। সড়ককে নিরাপদ করার ক্ষেত্রে সরকারকেই সবচেয়ে আগে এগিয়ে আসতে হবে। সরকার চাইলে সড়ক নিরাপদ করা কোন ব্যাপারই না।
অতীব দুঃখের বিষয় হলো, বিগত ২০ বছরে সব সরকারই সড়ককে নিরাপদ করার ক্ষেত্রে ছোট ছোট বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও প্রয়োজনীয় দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসেননি। আর তাই আংশিকভাবে সাফল্য পেলেও পরিপূর্ণ সাফল্য অর্জনের জন্যে সরকারকে আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসতে হবে।





0 comments:
Post a Comment